ভারতীয় ভিসা নিয়ে দালালচক্র থেকে সতর্ক করল হাইকমিশন

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় ভিসার আবেদন করতে আগ্রহীদের দালাল ও অননুমোদিত এজেন্টদের বিষয়ে সতর্ক করেছে ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন। ‘নিশ্চিত ভিসা’, ‘দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ’ কিংবা ‘নিশ্চিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট’ দেওয়ার নামে কেউ অর্থ আদায় বা বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে তা বিশ্বাস না করার আহ্বান জানিয়েছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।

বৃহস্পতিবার রাতে ভারতীয় হাইকমিশনের পক্ষ থেকে দেওয়া এক সতর্কবার্তায় বলা হয়, ভিসাপ্রত্যাশীদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন দালাল ও অননুমোদিত ব্যক্তি নানা ধরনের লোভনীয় প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণার চেষ্টা করছে। এসব প্রতিশ্রুতির ফাঁদে পড়লে আবেদনকারীরা আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র এবং মূল্যবান সময় হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

বাংলাদেশ থেকে ভারত ভ্রমণের ক্ষেত্রে চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা, পর্যটন এবং পারিবারিকসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিয়মিত ভিসার জন্য আবেদন করেন। এই ব্যাপক চাহিদাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ধরনের মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালচক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের মধ্যে দ্রুত ভিসা পাওয়ার আগ্রহ কিংবা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে উদ্বেগকে কাজে লাগিয়ে প্রতারকরা অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলে বিভিন্ন সময় অভিযোগ উঠে এসেছে।

এমন বাস্তবতায় ভারতীয় হাইকমিশনের নতুন এই সতর্কবার্তা ভিসাপ্রত্যাশীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

হাইকমিশন জানিয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা এজেন্ট যদি নিশ্চিতভাবে ভিসা পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, দ্রুত আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা বলে কিংবা নিশ্চিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ দাবি করে, তাহলে আবেদনকারীদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। কারণ ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে অনুমোদিত প্রক্রিয়ার বাইরে কোনো ব্যক্তি বা দালালের বিশেষ ক্ষমতা থাকার দাবি বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

সতর্কবার্তায় আবেদনকারীদের স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো অননুমোদিত ব্যক্তি বা এজেন্টের কাছে টাকা দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে ভিসা আবেদনসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ব্যক্তিগত তথ্য কিংবা গুরুত্বপূর্ণ নথিও তাদের হাতে তুলে দেওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ব্যক্তিগত তথ্য ও কাগজপত্র অননুমোদিত ব্যক্তির হাতে চলে গেলে শুধু আর্থিক প্রতারণাই নয়, পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের অপব্যবহার কিংবা ভিসা আবেদন প্রক্রিয়ায় জটিলতার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে। তাই ভিসাপ্রত্যাশীদের সতর্কতার সঙ্গে নির্ধারিত ও অনুমোদিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছে হাইকমিশন।

বিশেষভাবে ভারতের ট্রানজিট ভিসার আবেদনকারীদের সরাসরি নির্ধারিত সরকারি ভিসা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবেদন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। হাইকমিশনের মতে, মধ্যস্বত্বভোগী বা অননুমোদিত এজেন্টের মাধ্যমে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার আশায় আবেদন করলে উল্টো জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সম্প্রতি ভারতীয় ভিসা আবেদন প্রক্রিয়ায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। চলতি বছরের জুলাই থেকে বাংলাদেশের ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রগুলোতে সময়ভিত্তিক আবেদন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট বরাদ্দের ব্যবস্থা চালু করা হয়। ফলে আবেদনকারীদের নিজে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময় নির্বাচন করার প্রয়োজন হয় না বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল।

এই পরিবর্তনের কারণে ‘নিশ্চিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট’ পাইয়ে দেওয়ার নামে কোনো ব্যক্তি অর্থ দাবি করলে আবেদনকারীদের সতর্ক হওয়ার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে। কারণ সরকারি ব্যবস্থার বাইরে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা হতে পারে।

ভারতীয় হাইকমিশনের সর্বশেষ সতর্কবার্তা অবশ্য প্রথম নয়। এর আগেও বাংলাদেশে ভারতীয় ভিসাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। গত আগস্টে হাইকমিশন জানিয়েছিল, প্রতারকচক্র কখনো কখনো নিজেদের ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা ই-মেইলের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।

সেসময় হাইকমিশন স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল, তাদের কোনো কর্মকর্তা ফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ভিসা দেওয়ার প্রস্তাব দেবেন না কিংবা ভিসার বিনিময়ে অর্থ দাবি করবেন না। সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের এমন প্রস্তাব পেলে অর্থ প্রদান কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার না করার আহ্বান জানানো হয়েছিল।

এরও আগে ভিসা দালালদের মাধ্যমে জাল স্ট্যাম্প ও ভুয়া ভিসাসংক্রান্ত প্রতারণার অভিযোগ সামনে আসার পর ভারতীয় হাইকমিশন সতর্ক করেছিল। ওই সতর্কবার্তায় বলা হয়েছিল, কোনো এজেন্টের মাধ্যমে পাসপোর্টে জাল বা পরিবর্তিত তথ্য যুক্ত করা হলে তা ভবিষ্যতের ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রেও গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশ ভ্রমণ কিংবা ভিসা আবেদনকে কেন্দ্র করে প্রতারণার অন্যতম বড় কারণ হলো আবেদনকারীদের মধ্যে তথ্যের ঘাটতি। অনেকেই সঠিক সরকারি প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভর করেন। আবার কেউ কেউ দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার আশায় অতিরিক্ত অর্থ দিতে রাজি হন। এই প্রবণতাকে কাজে লাগিয়েই প্রতারকচক্র নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করে।

তবে ভিসাপ্রত্যাশীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোনো ব্যক্তি ‘নিশ্চিত ভিসা’ দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারেন না—এমন দাবি শুনলেই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কারণ ভিসা অনুমোদনের সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত যাচাই-বাছাই ও নিয়ম অনুসরণ করেই নেওয়া হয়।

হাইকমিশনের সর্বশেষ বার্তায় মূলত আবেদনকারীদের নিজেদের অর্থ, গুরুত্বপূর্ণ নথি এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভিসা আবেদন করতে গিয়ে পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য, ব্যাংক বা আর্থিক তথ্য এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত নথি অননুমোদিত কারও কাছে হস্তান্তর করলে তা পরবর্তীতে বড় ধরনের সমস্যার কারণ হতে পারে।

অনেক ক্ষেত্রে প্রতারকরা শুধু অর্থ হাতিয়ে নিয়েই থেমে থাকে না। আবেদনকারীর পাসপোর্ট বা ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে আরও জটিল প্রতারণার ঘটনাও ঘটতে পারে। তাই সরকারি বা অনুমোদিত প্রক্রিয়ার বাইরে কোনো ব্যক্তি বিশেষ সুবিধা দেওয়ার দাবি করলে তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি।

ভারতীয় হাইকমিশনের এই সতর্কবার্তা এমন এক সময়ে এসেছে যখন বাংলাদেশ থেকে ভারত ভ্রমণে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে চিকিৎসার প্রয়োজনে প্রতিবেশী দেশটিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বাংলাদেশি ভারতীয় ভিসার ওপর নির্ভরশীল। এ ছাড়া ব্যবসা, শিক্ষা, পর্যটন এবং পারিবারিক প্রয়োজনেও নিয়মিত ভিসা আবেদন করা হয়।

এই পরিস্থিতিতে ভিসাপ্রত্যাশীদের উদ্বেগ এবং প্রয়োজনকে পুঁজি করে অসাধু চক্র সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে আবেদনকারীদের সচেতনতা এবং সরকারি তথ্যসূত্র অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

হাইকমিশন আবেদনকারীদের প্রতি মূলত একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—ভিসা পাওয়ার জন্য কোনো শর্টকাটের ওপর নির্ভর না করে নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। দালাল কিংবা অননুমোদিত ব্যক্তির মিথ্যা আশ্বাসে অর্থ দেওয়া বা কাগজপত্র জমা দিলে ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা তো নেইই, বরং আবেদনকারী আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়তে পারেন।

বিশেষ করে ট্রানজিট ভিসার আবেদনকারীদের সরাসরি নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবেদন করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আবেদনকারীদের উদ্দেশে হাইকমিশনের সতর্কবার্তার সারকথা হলো—সতর্ক থাকুন, নিরাপদ থাকুন এবং ভিসাসংক্রান্ত সব তথ্য ও কার্যক্রমে শুধু অনুমোদিত প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করুন।

বাংলাদেশি ভিসাপ্রত্যাশীদের জন্য এই সতর্কবার্তা তাই শুধু একটি সাধারণ পরামর্শ নয়; বরং অর্থ, ব্যক্তিগত তথ্য, গুরুত্বপূর্ণ নথি এবং ভবিষ্যৎ ভ্রমণ পরিকল্পনা সুরক্ষিত রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। ভিসার আশায় দ্রুত সমাধানের প্রতিশ্রুতি যতই আকর্ষণীয় মনে হোক না কেন, অননুমোদিত ব্যক্তি বা দালালের মাধ্যমে কোনো ধরনের লেনদেনের আগে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দিয়েছে ভারতীয় হাইকমিশন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত