প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর মিরপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাচেষ্টা মামলায় ভোলা-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবকে গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। সোমবার (২০ জুলাই) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালত পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন। একই দিনে রাজধানীর ভাটারা থানার একটি পৃথক হত্যাচেষ্টা মামলায়ও তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হলেও সে বিষয়ে আদালত আদেশ পরে দেবেন বলে জানিয়েছেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, মিরপুর মডেল থানার মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আশরাফুৎদৌলা আদালতে আবেদন করে বলেন, মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে মো. আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো প্রয়োজন। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। শুনানি শেষে আদালত পুলিশের আবেদন মঞ্জুর করে তাঁকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর সেকশনে মিরপুর গার্লস আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নেন বাদী মো. রিফাত হোসেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, সেদিন দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে ৩০ থেকে ৪০ জন ব্যক্তি আগ্নেয়াস্ত্র, দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায় এবং এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে। এতে রিফাত হোসেনের ডান পায়ের হাঁটুর ওপরে গুলি লাগে।
মামলার এজাহারে আরও বলা হয়েছে, গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে গেলে হামলাকারীরা তাঁকে লাথি, কিল-ঘুষি এবং দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যার চেষ্টা করে। পরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত অন্য আন্দোলনকারীরা তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে এবং পরে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে প্রায় এক মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর পা থেকে গুলি অপসারণ করা হয়। দীর্ঘ চিকিৎসা ও শারীরিক পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে তাঁকে সুস্থ হওয়ার চেষ্টা করতে হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে দাবি করা হয়, সাবেক সংসদ সদস্য মো. আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একজন সক্রিয় নেতা ছিলেন এবং মামলায় উল্লিখিত ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তদন্তের স্বার্থে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো প্রয়োজন বলে পুলিশ আদালতের কাছে আবেদন জানায়।
একই দিনে রাজধানীর ভাটারা থানায় দায়ের করা আরেকটি হত্যাচেষ্টা মামলায়ও জ্যাকবকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়। তবে ওই মামলার বিষয়ে আদালত তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। আদালত জানিয়েছেন, আবেদনটি পর্যালোচনা শেষে পরবর্তীতে আদেশ দেওয়া হবে।
মো. আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব এর আগে ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর রাজধানীর গুলশান এলাকা থেকে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কর্তৃক গ্রেপ্তার হন। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে দায়ের হওয়া একাধিক মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনাগুলো নিয়ে এখনো বিভিন্ন থানায় দায়ের করা মামলার তদন্ত চলছে। এসব মামলায় সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে আদালতের নির্দেশে একের পর এক আসামিকে গ্রেপ্তার দেখানো এবং জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন করা হচ্ছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তিকে একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর অর্থ হলো সংশ্লিষ্ট মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত পরিচালনার আইনি ভিত্তি তৈরি হওয়া। এটি দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সমতুল্য নয়। বিচারিক প্রক্রিয়ার পর আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন এবং উভয় পক্ষের শুনানির ভিত্তিতেই মামলার চূড়ান্ত রায় নির্ধারিত হবে।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং জননিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর তদন্ত নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত সম্পন্ন হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের আইন অনুযায়ী আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করাও ন্যায়বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সংশ্লিষ্ট আদালত সূত্রে জানা গেছে, মিরপুরের মামলায় পরবর্তী শুনানির তারিখ অনুযায়ী তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হবে। পাশাপাশি ভাটারা থানার মামলায় আদালতের সিদ্ধান্তের পর সে মামলার পরবর্তী আইনি কার্যক্রমও নির্ধারিত হবে। ফলে সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবকে ঘিরে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়ার দিকে রাজনৈতিক ও আইনগত অঙ্গনের নজর এখন কেন্দ্রীভূত রয়েছে।