প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সমাজ ও তরুণ প্রজন্মের জন্য বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদকের করাল গ্রাস। দেশের প্রতিটি প্রান্তে, বিশেষ করে মফস্বল এলাকায় মাদকের যে বিস্তার ঘটেছে, তা জননিরাপত্তার জন্য এক বিরাট হুমকি। এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে বগুড়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মহিত তালুকদার মাদকের বিরুদ্ধে এক জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। সোমবার সকালে আদমদীঘি উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও বেশি সজাগ ও দায়িত্বশীল হওয়ার কঠোর নির্দেশ প্রদান করেন। তার মতে, মাদক কেবল একজন ব্যক্তিকে ধ্বংস করে না, বরং একটি পরিবারের স্বপ্ন এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঠেলে দেয়। তাই এই অপশক্তির বিরুদ্ধে যেকোনো মূল্যে রুখে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি।
আদমদীঘি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুমা বেগমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় সংসদ সদস্য আব্দুল মহিত তালুকদার তার বক্তব্যে মাদকের ভয়াবহতা ও তা নির্মূলের উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের কেবল পেশাগত দায়িত্ব হিসেবে নয়, বরং একটি নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে মাদকের উৎসমূল খুঁজে বের করতে হবে। তিনি মাদক ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটদের শনাক্ত করার ওপর জোর দিয়ে বলেন, অপরাধীদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে না। মাদক নির্মূল অভিযানে প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই। পারস্পরিক সমন্বয় ও তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে সমাজকে মাদকমুক্ত রাখা সম্ভব, যদি প্রতিটি স্তরের মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করেন।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তিনি স্থানীয় জনগণের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেছেন। কোনো সমাজই কেবল প্রশাসনের শক্তিতে শান্তি বজায় রাখতে পারে না, এর জন্য প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ। এমপি মহিত তালুকদার উপস্থিত সকল নেতৃবৃন্দকে তাদের নিজ নিজ এলাকায় মাদকবিরোধী জনমত তৈরির আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমরা যদি আমাদের সন্তানদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে চাই, তবে আগে সমাজকে কলুষমুক্ত করতে হবে। আজকের তরুণ প্রজন্ম আগামীর ভবিষ্যৎ, আর সেই ভবিষ্যৎকে মাদকের হাতে জিম্মি হতে দেওয়া যাবে না। তিনি প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে মাদকবিরোধী প্রচারণা চালানোর গুরুত্বের ওপর বিশেষ আলোকপাত করেন এবং সংশ্লিষ্টদের এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেন।
উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির এই সভায় উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশরাফুল ইসলাম, আদমদীঘি থানার ওসি কামরুজ্জামান মিয়াসহ স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। বিএনপির পক্ষ থেকে সহ-সভাপতি আব্দুল মোত্তাকিন তালুকদার এবং জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে নায়েবে আমির ডা. ইউনুস আলীসহ রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ সভায় অংশগ্রহণ করে মাদক নির্মূলের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকলেও, মাদকবিরোধী লড়াইয়ে সব পক্ষ যে ঐক্যবদ্ধ, তা এই সভার আলোচনার মাধ্যমেই ফুটে উঠেছে। সান্তাহার ইউপি চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিনসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও তাদের এলাকায় মাদক নির্মূলে প্রশাসনের সাথে সার্বক্ষণিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। এই ধরনের সর্বদলীয় অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, মাদক একটি সামাজিক অভিশাপ এবং একে নির্মূল করার দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের।
সভায় আদমদীঘির সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয় এবং অপরাধ প্রতিরোধে জননিরাপত্তা জোরদার করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ, চুরি ও ছিনতাই প্রতিরোধ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে সভার আলোচ্যসূচিতে নানা কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়। সংসদ সদস্য মহিত তালুকদার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, অপরাধীরা কোনো অবস্থাতেই রেহাই পাবে না এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে প্রশাসন যেন কোনো ধরনের শিথিলতা প্রদর্শন না করে। তিনি প্রশাসনকে আরও সক্রিয় হওয়ার পাশাপাশি তথ্যদাতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব আরোপ করেন। জননিরাপত্তা বজায় রাখতে পুলিশ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে যে বিশ্বাসের সেতুবন্ধন থাকা প্রয়োজন, তা সুদৃঢ় করার আহ্বান জানান তিনি।
বগুড়া-৩ আসনের আদমদীঘি ও দুপচাঁচিয়া এলাকায় মাদকের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তবর্তী ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। মাদক ব্যবসায়ীরা সাধারণত দুর্গম বা নিভৃত এলাকাগুলো বেছে নেয়, তাই নিয়মিত টহল এবং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির নির্দেশ দিয়েছেন এমপি মহিত। পাশাপাশি তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও খেলার মাঠগুলোর আশেপাশে যাতে মাদকের বিস্তার না ঘটে, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখার আহ্বান জানান। বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রমে শামিল করার পরামর্শ দেন তিনি। কারণ, সচেতনতাই হতে পারে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার।
পরিশেষে বলা যায়, মাদক নির্মূলে সংসদ সদস্য আব্দুল মহিত তালুকদারের এই কঠোর হুশিয়ারি এবং সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক আশার সঞ্চার করেছে। একটি নিরাপদ ও মাদকহীন উপজেলা গড়ার স্বপ্ন কেবল তখনই বাস্তব রূপ পাবে, যখন প্রশাসন তার পেশাদারিত্বের প্রমাণ দিবে এবং জনগণ তাদের পাশে এসে দাঁড়াবে। আদমদীঘি উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির এই সভা কেবল একটি মাসিক রুটিন কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, বরং এটি একটি সামাজিক আন্দোলনের রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। আশা করা যায়, এমপি মহিতের এই দৃঢ় নির্দেশনার আলোকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের কার্যক্রম আরও গতিশীল করবে এবং খুব দ্রুতই আদমদীঘি ও দুপচাঁচিয়া অঞ্চল মাদকমুক্ত হয়ে একটি সুন্দর ও সুস্থ পরিবেশে ফিরে আসবে। এটাই আমাদের সকলের প্রত্যাশা এবং এই প্রত্যাশা পূরণে রাষ্ট্র ও সমাজকে যৌথভাবে দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকতে হবে।