অভ্যুত্থানে মাদ্রাসার অবদানের স্বীকৃতি দাবি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬
  • ২৮ বার
অভ্যুত্থানে মাদ্রাসার অবদানের স্বীকৃতি দাবি

প্রকাশ: ২১ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জুলাই মাসের ঐতিহাসিক ও রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে দেশের কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসার অকুতোভয় শিক্ষার্থীদের অতুলনীয় সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং অনন্য অবদানকে অবিলম্বে রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়ার জোরালো ও সুষ্পষ্ট দাবি জানিয়েছেন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি বা এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন যে, গত জুলাই মাসে যখন স্বৈরাচারী শক্তির চরম দমনপীড়ন ও নির্বিচারে চালানো হত্যাযজ্ঞের মুখে আন্দোলন প্রায় স্তিমিত ও নিষ্ক্রিয় হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, ঠিক সেই অত্যন্ত সংকটময় ও দুর্দিনেও দেশের সাধারণ ছাত্রসমাজ ও জনতার মাঝে নতুন করে পুনর্জাগরণ ও আন্দোলনের অপ্রতিরোধ্য দাবানল ছড়িয়ে দিয়েছিল মূলত মাদ্রাসার ছাত্রসমাজ এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহসী শিক্ষার্থীরা। গত দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে অবিরাম বঞ্চনা, অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হওয়া মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের এই পবিত্র ও রক্তমাখা জুব্বা কোনো সাধারণ বা গতানুগতিক পোশাক নয়, বরং এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন বিদ্রোহ এবং দীর্ঘ লড়াইয়ের এক দীপ্ত ও চিরন্তন প্রতীক। সরকারের নীতিমালার সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অবিলম্বে এই বীর শিক্ষার্থীদের রক্তক্ষয়ী ত্যাগ, আত্মোৎসর্গ ও অবদানকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা জানানোর দাবি জানান তিনি।

গতকাল সোমবার রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্র সেগুনবাগিচায় অবস্থিত স্বনামধন্য বিএমএ ভবন মিলনায়তনে ‘জুলাইয়ের রক্তাক্ত জুব্বা: মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অবদান’ শীর্ষক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, সময়োপযোগী ও প্রাণবন্ত এক বিশেষ সেমিনারে প্রধান অতিথির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে তিনি এই আহ্বান জানান। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপের দায়িত্ব পালনকারী নাহিদ ইসলাম তার বক্তব্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন নীতি ও কার্যক্রমের কঠোর সমালোচনা করে বলেন যে, একটি নির্দিষ্ট মহল অত্যন্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জুলাইয়ের পবিত্র চেতনাকে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য নানা ধরনের অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে এবং কেউ জুলাইয়ের আদর্শ ও জনগণের অধিকারের কথা বললেই তাকে সস্তা চেতনার ব্যবসা বলে উপহাস করা হচ্ছে। অথচ এ দেশের সাধারণ জনগণ কোনো ধরনের লোকদেখানো বাহানা বা মিথ্যা আশ্বাস চায় না, তারা চায় রাষ্ট্রের কাঠামোগত, মৌলিক ও প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আর এটাই মূলত আমাদের কাঙ্ক্ষিত জুলাইয়ের মূল চেতনা। অবিলম্বে সরকারের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিনের জমে থাকা সংস্কার প্রস্তাবগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জোরালো দাবি জানিয়ে তিনি বলেন যে, বিগত নির্বাচন কখনোই প্রচলিত বা গতানুগতিক সাংবিধানিক ধারায় সম্পন্ন হয়নি, বরং এক রক্তক্ষয়ী ঐতিহাসিক বিপ্লবের পর দেশের সাধারণ মানুষের পবিত্র আকাঙ্ক্ষা এবং স্বতঃস্ফূর্ত আদেশের মাধ্যমেই নির্বাচন ও ঐতিহাসিক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে নাহিদ ইসলাম আরও বলেন যে, সরকার বর্তমানে তথাকথিত সংবিধান সংশোধন কমিটির নামে যে প্রহসনমূলক ও অগ্রহণযোগ্য কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, অবিলম্বে সেই বিতর্কিত পথ থেকে সরে এসে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে অর্জিত ঐতিহাসিক গণভোটের রায় পুরোপুরি ও নির্বিঘ্নে বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় দেশের সর্বস্তরের ওলামায়ে কেরামসহ জুলাই অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত দেশের আপামর জনসাধারণ ও সকল সংগ্রামী শক্তি বাধ্য হয়ে আবারও রাজপথে নেমে এসে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবে। উক্ত সেমিনারে প্রধান আলোচক হিসেবে অত্যন্ত মূল্যবান, তথ্যবহুল ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সম্মানিত আমির মাওলানা মামুনুল হক। এছাড়া অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির মর্যাদাপূর্ণ আসন অলংকৃত করে অত্যন্ত উদ্দীপক বক্তব্য দেন বিশিষ্ট রাষ্ট্রচিন্তক ফরহাদ মজহার, প্রখ্যাত চিন্তক মুসা আল হাফিজ, এনসিপির দায়িত্বশীল যুগ্ম সদস্যসচিব ও মাননীয় সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিনসহ দেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় ইসলামী সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

সেমিনারে উপস্থিত দেশের বরেণ্য বক্তারা এক বাক্যে অত্যন্ত জোরালোভাবে স্বীকার করেন যে, জুলাই অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত ও ঐতিহাসিক বিজয় অর্জনে দেশের মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা যেভাবে নিজের জীবন বাজি রেখে রাজপথে বুক পেতে দিয়েছিল, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অনন্য, গৌরবোজ্জ্বল ও স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সেই উত্তাল ও ভয়ংকর দিনগুলোতে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল, গরম পানি ও নির্বিচারে চালানো তাজা বুলেটের সামনে কোনো কিছুর বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে মাদ্রাসার ছাত্ররা যেভাবে ফ্রন্টলাইনে বা অগ্রভাগে থেকে সাহসিকতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছিল, তা কেবল তাদের ব্যক্তিগত বা দাপ্তরিক সাহসিকতারই প্রমাণ দেয় না, বরং দেশের চরম সংকটময় মুহূর্তে তাদের দেশপ্রেমের গভীরতা ও আপসহীন চরিত্রকেও অত্যন্ত উজ্জ্বলভাবে তুলে ধরে। বক্তারা গভীর আক্ষেপ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে এই কওমি ও আলিয়া ধারার মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের অসামান্য অবদানকে খাটো করে দেখার এক গভীর মানসিকতা বা ষড়যন্ত্র কাজ করেছে, যা আজকের স্বাধীন ও নতুন বাংলাদেশে আর কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। রাষ্ট্রীয় মূলধারায় এবং প্রকৃত জাতীয় বীরের মর্যাদায় এই শিক্ষার্থীদের অবদানকে দেশের শিক্ষা সিলেবাস, ইতিহাস এবং রাষ্ট্রীয় দলিলপত্রে স্থায়ীভাবে স্থান দিতে হবে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে বক্তারা দেশের বর্তমান সামগ্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং জুলাইয়ের শহীদদের পবিত্র রক্তের সঙ্গে কোনো ধরনের বেইমানি না করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান। তারা বলেন যে, জনগণের মনে যে গভীর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে তা দ্রুত দূর করার একমাত্র ও মোক্ষম পথ হলো অভ্যুত্থানের মূল চেতনাকে পরিপূর্ণভাবে ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ করা। মাদ্রাসার লাখ লাখ ছাত্র ও শিক্ষকের মেধা, শ্রম, ঘাম এবং রক্ত ও জীবনের বিনিময়ে অর্জিত এই নতুন বাংলাদেশে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আধিপত্য, শোষণ বা বৈষম্য কোনোভাবেই চলতে দেওয়া হবে না। সেমিনার কক্ষজুড়ে উপস্থিত হাজারো ছাত্র, তরুণ, মাদ্রাসার শিক্ষক ও সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি, স্লোগানে মুখরিত এক আবেগঘন ও ঐতিহাসিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে এই অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়, যা আগামী দিনের জাতীয় রাজনীতি ও আন্দোলনের অঙ্গনে এক গভীর, সুদূরপ্রসারী ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেই দেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত