রাজনৈতিক মিত্রদের নিয়ে নতুন কৌশলে সরকার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬
  • ৪২ বার
রাজনৈতিক মিত্রদের নিয়ে নতুন কৌশলে সরকার

প্রকাশ:  ২১ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, রাজপথের সংগ্রাম এবং বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক সমীকরণে বিএনপির দীর্ঘদিনের মিত্র ও যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন ও পদপদবি প্রাপ্তি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র অসন্তোষ ও নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটছে না। ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর গত ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করে। কিন্তু সরকার গঠনের দীর্ঘ পাঁচ মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযাত্রী ও জোটসঙ্গী অনেক দলের শীর্ষ নেতারা সরকারের নীতিনির্ধারণী কিংবা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি থেকে বঞ্চিত হওয়ায় তাদের মনে ক্ষোভ ও হতাশার দানা বাঁধতে শুরু করেছে। কখনো কৌশলী চাপ প্রয়োগ আবার কখনো প্রকাশ্য মানাভঞ্জনের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে এই রাজনৈতিক প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব মেলাতে গিয়ে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যা দেশের রাজনৈতিক ময়দানে নতুন এক সমীকরণের জন্ম দিয়েছে।

গত সোমবার রাতে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সম্মানিত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একান্ত আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সম্মানে একটি বিশেষ নৈশভোজ ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়েছিল। শরিকদের এই ক্ষোভ প্রশমিত করতে এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দূরত্ব ঘুচিয়ে পারস্পরিক আস্থাকে সুদৃঢ় করতেই মূলত এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এর আগে নিজ দলীয় পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে বিএনপিতে যোগদানকারী এবং নির্বাচনে ভোটসঙ্গী হওয়া তরুণ নেতা রাশেদ খানকে সচিবের পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী হিসেবে বিশেষ নিয়োগ প্রদান করা হয়। এই নিয়োগের পর থেকেই দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও অসন্তোষের সৃষ্টি হলেও সরকারপ্রধান মূলত সবাইকে ধৈর্য ধারণের বার্তা দিয়ে দলের বৃহত্তর ঐক্যের ওপর জোর দিচ্ছেন। বিগত দিনগুলোতে যারা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে বুক চিতিয়ে লড়াই করেছেন এবং মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন, তাদের একটি বড় অংশ সরকারের অংশীদার হতে না পারায় ভেতরে ভেতরে ফুসে উঠছে। ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশ নির্বাচনে প্রত্যাশিত আসন বা সরকারি দায়িত্ব না পাওয়ায় তাদের এই হতাশা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে, যা সাম্প্রতিক বিভিন্ন দলীয় কর্মকাণ্ড ও অনুপস্থিতির মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি তাদের যুগপৎ আন্দোলনের বিভিন্ন শরিক দলের জন্য সর্বমোট পনেরোটি আসন ছেড়ে দিয়েছিল। এর মধ্যে নিজস্ব দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া কয়েকটি দলের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়ে নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থানও লাভ করেছেন। গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি এবং গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে নতুন সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। এছাড়া এনডিএমের চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগদানকারী ববি হাজ্জাজ নির্বাচনে জয়লাভের পর বর্তমানে সরকারের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নাগরিক ঐক্যের যুগ্ম সম্পাদকের পদ থেকে ইস্তফা দেওয়া রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. জাহেদ উর রহমান প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত বিশেষ উপদেষ্টার মর্যাদাপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। তবে এসব ব্যক্তিরা নিজ নিজ দলীয় পরিচয় কিংবা শেষ মুহূর্তে বিএনপিতে যোগ দিয়ে নিজেদের অবস্থান পাকা করলেও, গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২ দলীয় জোট এবং জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের বিশাল একটি অংশের মূল দলগুলোর শীর্ষ নেতারা কোনো ধরনের পদপদবি বা মূল্যায়ন না পেয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ দেড় দশকের আন্দোলনে বিএনপির নেতৃত্বে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া গণতন্ত্র মঞ্চের অন্তর্ভুক্ত শরিক দলগুলোর মধ্যেও প্রাপ্তি এবং অপ্রাপ্তির একটি বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে। আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বা জেএসডি নির্বাচনে কোনো আসন পায়নি এবং সরকারের অংশীদারও হতে পারেনি। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান কমরেড সাইফুল হক নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হতে পারেননি। অন্যদিকে ভাসানী অনুসারী পরিষদ ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের মতো শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা নির্বাচনে কোনো আসনই লাভ করতে পারেননি এবং নতুন সরকারের কোনো পদ-পদবিও তাদের ভাগ্যে জোটেনি। একইভাবে ১২ দলীয় জোট এবং জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের শরিক দলগুলোর একটি বড় অংশ সময়ের বিবর্তনে বিভিন্ন দিকে বিভক্ত হয়ে পড়ায় এবং নির্বাচনে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করতে না পারায় তারা ক্ষমতার অংশীদারিত্ব থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়েছেন। বিশেষ করে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ দলটিকে বিএনপি নির্বাচনে সর্বোচ্চ চারটি আসন ছেড়ে দিলেও তাদের কোনো প্রার্থী শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হতে পারেননি। এর ফলে সরকার গঠনের পর শরিক দল হিসেবে তাদের যথাযথ মূল্যায়ন না করায় জমিয়তের ভেতরে চরম অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে, যা সাম্প্রতিক প্রকাশ্য বক্তব্যেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, বিগত দিনে বিএনপির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করলেও নির্বাচনের পর থেকে দলটির পক্ষ থেকে তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ বা কুশল বিনিময় পর্যন্ত করা হয়নি। জোটের অন্য শরিকদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে মূল্যায়ন করা হলেও জমিয়তকে ধারাবাহিকভাবে উপেক্ষা করার এই প্রবণতা অত্যন্ত রহস্যজনক বলে মনে করছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। আর এই সুদীর্ঘ অবহেলা ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই সোমবার রাতে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক আয়োজিত বিশেষ নৈশভোজ ও মতবিনিময় সভায় সব প্রস্তুতি ও আমন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও জমিয়তের শীর্ষ নেতারা সজ্ঞানে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন। দলটির দায়িত্বশীল নেতারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, সরকার গঠনের দীর্ঘ পাঁচ মাস পর কেবল আনুষ্ঠানিক আহারের জন্য দাওয়াত রক্ষা করতে যাওয়ার কোনো রাজনৈতিক তাৎপর্য নেই, যদি না তাদের দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও অবদানের উপযুক্ত মূল্যায়ন করা হয়। অন্যদিকে জমিয়তের এই অনুপস্থিতি এবং ইসলামপন্থি দলগুলোর এই ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক জোটের ভেতরে এক নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। কওমি মাদ্রাসা ও সমমনা আলেম সমাজের একটি বড় অংশের এই দূরত্ব আগামী দিনে সরকারের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

অন্যদিকে শরিক দলগুলোর এই প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির জটিল সমীকরণ ও পদবীবঞ্চনার পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের নিজস্ব মূল ধারার নেতাকর্মীদের মধ্যেও তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের পদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগদানের পর রাশেদ খানকে সচিবের মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাটি দলের ভেতরে প্রবল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে কারাবরণ, নির্যাতন ও সীমাহীন ত্যাগের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা ছাত্রদল এবং যুবদলের পরীক্ষিত ও রাজপথের লড়াকু নেতারা মনে করছেন যে, দলের দুর্দিনের পরীক্ষিত ত্যাগী নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন করে এভাবে নবাগত বা অন্য দল থেকে আসা ব্যক্তিদের হুট করে বড় পদে পুরস্কৃত করা হলে তা তৃণমূলের মনোবল ভেঙে দেবে। একজন সাবেক ছাত্রদল নেতার মতে, দলের এই একপেশে মূল্যায়ন নীতি আগামী দিনে দলের ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং এর ফলে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত জোটসঙ্গী ও নিজস্ব নেতাকর্মীদের মধ্যকার আস্থার সংকট আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। একদিকে শরিক দলগুলোর নানামুখী অভিমান এবং অন্যদিকে নিজ দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের ক্ষোভ—এই দুইয়ের চরম বাস্তবতার মাঝে দাঁড়িয়ে সরকারপ্রধান তারেক রহমানকে অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক দূরদর্শিতার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে, যাতে আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনা ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা কোনোভাবেই হোঁচট না খায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত