শরিকদের দূরে যেতে দিতে চান না প্রধানমন্ত্রী: মান্না

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৭ বার
শরিকদের দূরে যেতে দিতে চান না প্রধানমন্ত্রী: মান্না

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকার ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর সম্পর্ক, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমন্বয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন প্রশ্নকে ঘিরে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের বৈঠক রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বৈঠক শেষে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার বক্তব্যে উঠে এসেছে বৈঠকের পরিবেশ, আলোচনার ধরন, শরিক দলগুলোর প্রত্যাশা এবং সরকারের প্রতি তাদের অবস্থানের বিভিন্ন দিক।

সোমবার (২০ জুলাই) রাতে রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের শরিক রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি জানান, বৈঠকে আনুষ্ঠানিক পরিবেশ বজায় থাকলেও নির্দিষ্ট কোনো এজেন্ডাভিত্তিক আলোচনা হয়নি। তবে সরকারের বর্তমান কার্যক্রম, শরিক দলগুলোর ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমন্বয় নিয়ে বিভিন্ন নেতা নিজ নিজ মতামত তুলে ধরেছেন।

মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, তাঁর ব্যক্তিগত উপলব্ধি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৈঠকের মাধ্যমে একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছেন। সেই বার্তা হলো, যুগপৎ আন্দোলনে যেসব রাজনৈতিক দল একসঙ্গে আন্দোলন করেছে, তারা যেন ক্ষমতায় আসার পর সরকারের কাছ থেকে দূরে সরে না যায়। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী এমন একটি মনোভাব প্রকাশ করেছেন যাতে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক অব্যাহত থাকে এবং রাজনৈতিক দূরত্ব সৃষ্টি না হয়।

মান্না বলেন, প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় থাকলেও তিনি উপলব্ধি করেছেন যে সরকারের বাইরের মিত্র দলগুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, প্রধানমন্ত্রী এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখতে আগ্রহী, যেখানে আন্দোলনের সময়কার সহযোগী দলগুলো নিজেদের বিচ্ছিন্ন বা উপেক্ষিত মনে না করে। তিনি এটিকে ইতিবাচক রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে উল্লেখ করলেও বলেন, ভবিষ্যতে এই মনোভাব বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হয়, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বৈঠকের আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানতে চাইলে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আনুষ্ঠানিকতার দিক থেকে বৈঠক সফল হলেও কোনো পূর্বনির্ধারিত এজেন্ডা ছিল না। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা নিজেদের পর্যবেক্ষণ ও মতামত তুলে ধরেছেন। কেউ কেউ সরকারের কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাদের বক্তব্য ছিল, ক্ষমতার অংশীদার হিসেবে কাজ করার সুযোগ থাকলে তারা সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।

তিনি আরও জানান, কয়েকজন নেতা অভিযোগ করেছেন যে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে শরিক দলগুলো পর্যাপ্তভাবে অবগত নয়। তাদের মতে, সরকার পরিচালনার অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় শরিক দলগুলোর মতামত বা অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হচ্ছে না। এ বিষয়টি বৈঠকে উত্থাপিত হলেও তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি।

মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, বিগত কয়েক মাসে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের ভালো-মন্দ নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত বা সুপারিশ গ্রহণ করা হয়নি। তিনি মনে করেন, ভবিষ্যতে যদি এ ধরনের বৈঠক নিয়মিত হয় এবং সেখানে নীতিগত বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়, তাহলে সরকার ও শরিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।

বিরোধী দলের চলমান আন্দোলন, ৩১ দফা কর্মসূচি এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় সংস্কার প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, তিনি সব শরিক দলের পক্ষ থেকে বক্তব্য দিতে পারবেন না। তবে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, বিরোধী দল যে কর্মসূচি দিচ্ছে বা ভবিষ্যতে দেবে, তা তারা পর্যবেক্ষণ করবেন। বিরোধী পক্ষের প্রধান অভিযোগ হলো, সরকার প্রত্যাশিত সংস্কার বাস্তবায়ন করছে না এবং জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যাচ্ছে। এই অভিযোগের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে এবং এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম, বিচারক নিয়োগের স্বচ্ছতা, সচিবালয়ের প্রশাসনিক সংস্কারসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে। যুগপৎ আন্দোলনের সময় যেসব সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল, বর্তমান সরকারের কিছু কর্মকাণ্ড তার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে এসব সংবেদনশীল বিষয় বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে ছিল না এবং সে কারণে বিস্তারিত আলোচনা করার সুযোগও তৈরি হয়নি।

মাহমুদুর রহমান মান্না স্পষ্ট করে বলেন, তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান সরকারের অন্ধ সমর্থন নয়। তবে তারা চান বর্তমান সরকার সফল হোক এবং দক্ষতার সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা করুক। তিনি বলেন, দেশের স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক অগ্রগতির স্বার্থে সরকারের সফলতা গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই সফলতা হতে হবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে। তিনি এটিও স্পষ্ট করেন যে সরকার কোনো সংকটে পড়েছে বলেই শরিকদের ডাকা হয়েছে—এমন ধারণা তাঁর কাছে সঠিক মনে হয়নি। বরং এটি ছিল রাজনৈতিক যোগাযোগ ও মতবিনিময়ের একটি উদ্যোগ।

বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্য প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মান্না বলেন, ভবিষ্যতে শরিক দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত বৈঠকের ঘোষণা ইতিবাচক। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই ঘোষণা যেন কেবল আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বাস্তবেও যদি নিয়মিত মতবিনিময় ও সমন্বয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে শরিক দলগুলো অবশ্যই তাতে অংশ নেবে এবং যৌথ রাজনৈতিক কার্যক্রম আরও শক্তিশালী হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাসীন জোট এবং যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর সম্পর্ক ভবিষ্যতের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে রাষ্ট্র সংস্কার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক অংশীদারিত্বের প্রশ্নে শরিক দলগুলোর মতামত উপেক্ষা করা হলে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে নিয়মিত সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা এবং অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আরও সুদৃঢ় করা সম্ভব বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এই বৈঠক তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিক মতবিনিময় নয়, বরং ক্ষমতাসীন জোটের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমন্বয়, শরিকদের ভূমিকা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদারিত্ব নিয়ে নতুন আলোচনারও সূচনা করেছে। আগামী দিনগুলোতে ঘোষিত নিয়মিত বৈঠক বাস্তবে অনুষ্ঠিত হয় কি না এবং শরিক দলগুলোর উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্ন ও প্রত্যাশার কী ধরনের প্রতিফলন সরকারের নীতিনির্ধারণে দেখা যায়, সেদিকেই এখন রাজনৈতিক মহলের দৃষ্টি থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত