তিন নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে, বাড়ছে বন্যার শঙ্কা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৬ বার
তিন নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে, বাড়ছে বন্যার শঙ্কা

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং ভারতের উজান এলাকায় টানা ভারী বর্ষণের প্রভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের তিনটি নদীর চারটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পানি ইতোমধ্যে বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। পাশাপাশি আরও বেশ কয়েকটি নদীর পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে, যা সংশ্লিষ্ট এলাকায় বন্যার আশঙ্কা আরও জোরালো করেছে।

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সকাল ৯টায় প্রকাশিত বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ১২৭টি পর্যবেক্ষণ স্টেশনের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ৭৫টি স্টেশনে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ৪৮টি স্টেশনে পানি কমেছে এবং দুটি স্টেশনে পানির উচ্চতা অপরিবর্তিত রয়েছে। পানি বৃদ্ধির এই প্রবণতা উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদী অববাহিকায় বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে উজান থেকে নেমে আসা ঢল এবং স্থানীয় বৃষ্টিপাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জের ছাতক পয়েন্টে বিপদসীমার ৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সময়ে কুশিয়ারা নদীর পানি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমার ৩২ সেন্টিমিটার এবং সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে ১ সেন্টিমিটার ওপরে অবস্থান করছে। অন্যদিকে নেত্রকোণার কলমাকান্দা পয়েন্টে সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপদসীমার ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এসব এলাকার নিম্নাঞ্চলে ইতোমধ্যে পানি প্রবেশ করেছে এবং নদীতীরবর্তী মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করা মানেই সব এলাকায় তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের বন্যা সৃষ্টি হবে—এমন নয়। তবে পানি যদি দীর্ঘ সময় ধরে বিপদসীমার ওপরে থাকে কিংবা উজান থেকে আরও ঢল নামে, তাহলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ, সিলেট ও নেত্রকোণার হাওর ও নদীতীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, বর্তমানে আরও বেশ কয়েকটি নদীর পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। এর মধ্যে রয়েছে সুরমা নদীর সুনামগঞ্জ স্টেশন, কুশিয়ারা নদীর শেরপুর স্টেশন, দুধকুমার নদীর পাটেশ্বরী, ধরলা নদীর কুড়িগ্রাম, তিস্তা নদীর ডালিয়া, কাউনিয়া, তারাপুর ও হরিপুর স্টেশন, ব্রহ্মপুত্র নদীর হাতিয়া ও চিলমারী এবং যমুনা নদীর সাঘাটা, সারিয়াকান্দি ও জগন্নাথগঞ্জ পয়েন্ট। এসব স্থানে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে দ্রুত পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ ৮৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে সিরাজগঞ্জে। এছাড়া রাজশাহীতে ৭৯ মিলিমিটার, চাঁদপুরে ৭০ মিলিমিটার এবং বরগুনায় ৬৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন নদীর উজান এলাকাতেও উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কালিম্পংয়ে ১২০ মিলিমিটার এবং দার্জিলিংয়ে ৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। উজানের এসব বৃষ্টির পানি ধীরে ধীরে বাংলাদেশের নদীগুলোতে প্রবেশ করায় আগামী কয়েক দিন পানি বৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।

জলবিদ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা মৌসুমে উজানের অতিবৃষ্টি বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদীগুলোর জন্য বড় ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করে। বিশেষ করে সুরমা, কুশিয়ারা, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এ কারণে নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষকে আগাম সতর্কতা মেনে চলা এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, তারা সার্বক্ষণিকভাবে নদীর পানির উচ্চতা পর্যবেক্ষণ করছে এবং পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে দ্রুত নতুন পূর্বাভাস প্রকাশ করা হবে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সম্ভাব্য বন্যা মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট এলাকায় বসবাসকারী অনেকেই ইতোমধ্যে নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নিম্নাঞ্চলের কৃষিজমি, মাছের ঘের এবং বসতবাড়িতে পানি প্রবেশের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের কৃষক ও দিনমজুরদের মধ্যে উৎকণ্ঠা বাড়ছে। তারা আশা করছেন, পানি দীর্ঘ সময় ধরে বৃদ্ধি না পেলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। প্রয়োজনে আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা, ত্রাণসামগ্রী মজুত এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি নদীতীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে গুজবে বিভ্রান্ত না হয়ে সরকারি তথ্য ও নির্দেশনার ওপর নির্ভর করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, আবহাওয়ার পরিস্থিতি এবং উজানের বৃষ্টিপাতের ওপর আগামী কয়েক দিনের নদীর পানির প্রবণতা অনেকটাই নির্ভর করবে। যদি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকে, তাহলে আরও কয়েকটি নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। ফলে সংশ্লিষ্ট জেলার মানুষকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বর্ষাকালে নদীর পানি বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য স্বাভাবিক ঘটনা হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৃষ্টিপাতের ধরন এবং উজানের ঢলের তীব্রতায় পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই আগাম পূর্বাভাস, দ্রুত তথ্য সরবরাহ এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি জোরদার করাকেই সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত