প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর-মানিকগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের ওপর সংঘটিত এক মর্মান্তিক, হৃদয়বিদারক ও পৈশাচিক সড়ক দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই এক সিএনজিযাত্রী নিহত হয়েছেন এবং অত্যন্ত গুরুতর ও আশঙ্কাজনক অবস্থায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত তিনজন নিরীহ মানুষ। মঙ্গলবার সকালে ব্যস্ততম এই আঞ্চলিক সড়কের মিদুলিয়া ডাবল ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় দ্রুতগতির একটি অনিয়ন্ত্রিত মালবাহী ট্রাকের সঙ্গে একটি যাত্রীবাহী সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলেই এই ভয়াবহ ও মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
প্রতিদিনের মতো সাধারণ মানুষ ও কর্মজীবী মানুষেরা যখন নিজ নিজ গন্তব্যে এবং কর্মস্থলে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে ভোরবেলা ঘর থেকে বের হয়েছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি পুরো সিংগাইর এলাকজুড়ে এক গভীর শোকের ও কান্নার ছায়া নেমে আসে। দুর্ঘটনার পরপরই বিকট শব্দ শুনে আশপাশের এলাকার শত শত স্থানীয় এলাকাবাসী ও পথচারীরা দ্রুত দৌড়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং নিজ নিজ উদ্যোগে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
রক্তাক্ত ও সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত অবস্থায় সিএনজি থেকে যাত্রীদের অত্যন্ত কষ্টে উদ্ধার করে দ্রুততার সঙ্গে সিংগাইর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রেরণের ব্যবস্থা করা হয়, যা উপস্থিত সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা, আতঙ্ক ও হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা করে। স্থানীয় সূত্রে এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত বিস্তারিত বিবরণে জানা গেছে যে, মঙ্গলবার সকাল আনুমানিক আটটার দিকে মানিকগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা কিংবা বিপরীত দিক থেকে অত্যন্ত বেপরোয়া গতিতে ধেয়ে আসা একটি নিয়ন্ত্রণহীন ভারী ট্রাকের সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির মুখোমুখি ও তীব্র সংঘর্ষ হয়।
আকস্মিক এই সংঘর্ষের তীব্রতা এতটাই প্রচণ্ড ও ভয়াবহ ছিল যে, সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি সম্পূর্ণ দুমড়ে-মুচড়ে রাস্তার পাশে একটি গভীর খাঁদে ছিটকে পড়ে এবং এর ভেতরে থাকা যাত্রীরা মারাত্মকভাবে আঘাত পেয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। ঘটনার পরপরই ঘাতক ট্রাকের চালক অত্যন্ত অমানবিকভাবে এবং চরম চতুরতার সঙ্গে তার দ্রুতগতির ভারী গাড়িটি আরও জোরে চালিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
ব্যস্ত সড়কে এই ধরনের বেপরোয়া গাড়ি চালানো এবং বড় ধরনের দুর্ঘটনার পর আহত অসহায় মানুষগুলোকে চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে উল্টো পালিয়ে যাওয়ার এই নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক প্রবৃত্তি সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণার জন্ম দিয়েছে। ব্যস্ত এই আঞ্চলিক সড়কে প্রায়শই এই ধরনের অতিরিক্ত গতির ভারী গাড়ি চলাচলের কারণে সাধারণ যাত্রী ও পথচারীদের জীবন প্রতিনিয়ত চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে স্থানীয় ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা অত্যন্ত জোরালো অভিযোগ করেছেন।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সিংগাইর থানা পুলিশ দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় এবং পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে স্থানীয়দের সহায়তায় উদ্ধার কার্যক্রমে তদারকি করে। পুলিশি প্রাথমিক তদন্ত ও সুরতহাল প্রস্তুতের সময় নিহত ব্যক্তির পকেট থেকে একটি জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি উদ্ধার করা হয়, যার মাধ্যমে তার প্রাথমিক পরিচয় শনাক্ত করার একটি ক্ষীণ প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল।
প্রাপ্ত ওই পরিচয়পত্র অনুযায়ী নিহত ব্যক্তির নাম মো. রফিকুল ইসলাম এবং তার স্থায়ী ঠিকানা টাঙ্গাইল সদর উপজেলার মুদ্দোযোগিনি বলে উল্লেখ রয়েছে। তবে অত্যন্ত বিস্ময়কর ও রহস্যজনক বিষয় হলো, পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধান, পারিপার্শ্বিক তথ্য এবং নিহতের বাহ্যিক শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ওই পরিচয়পত্রের ছবির বা তথ্যের কোনো ধরনের ন্যূনতম মিল পাওয়া যায়নি।
ফলে নিহত ব্যক্তির প্রকৃত ও সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য পুলিশ এখন আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য, ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা বায়োমেট্রিক পদ্ধতিসহ বিভিন্ন নিবিড় তদন্ত পদ্ধতি অবলম্বন করতে বাধ্য হচ্ছে। একজন মানুষের আকস্মিক এমন মর্মান্তিক ও আকস্মিক মৃত্যুর পর তার সঠিক পরিচয় উদ্ঘাটন না হওয়া পর্যন্ত পরিবারের সন্ধান পাওয়াও চরমভাবে দুরূহ হয়ে পড়েছে, যা এই পুরো দুর্ঘটনাটিকে আরও বেশি রহস্যঘেরা, মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক করে তুলেছে।
সিংগাইর থানার সম্মানিত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি মো. মাজহারুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিশ্চিত করে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন যে, ভারী ট্রাক ও সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে একজন যাত্রীর এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর বিষয়টি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান যে, এই দুর্ঘটনায় গুরুতর ও আশঙ্কাজনকভাবে আহত হওয়া অন্য তিন জন যাত্রী বর্তমানে সিংগাইর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং সেখানকার কর্তব্যরত দক্ষ চিকিৎসকরা তাদের যেকোনো মূল্যে বাঁচিয়ে তোলার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা ও চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
নিহত ব্যক্তির আসল পরিচয় শনাক্ত করার আইনি প্রক্রিয়া, ডিএনএ বা অন্যান্য দাপ্তরিক কার্যক্রম বর্তমানে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে চলমান রয়েছে। পাশাপাশি দুর্ঘটনার পরপরই যে ট্রাকচালক গাড়ি নিয়ে পালিয়ে গেছে, তাকে এবং সেই ঘাতক ভারী ট্রাকটিকে খুব দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য স্থানীয় পুলিশের একাধিক বিশেষ টিম জোরদার অভিযান পরিচালনা করছে। এই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট আইনে প্রয়োজনীয় কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে থানা পুলিশের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।