ইরান সংকটে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৪ বার
ইরান সংকটে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে তীব্র হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রে আবারও প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের জাতীয় গড় মূল্য ৪ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, যার প্রভাব এখন শুধু আন্তর্জাতিক বাজারেই নয়, সাধারণ মার্কিন ভোক্তাদের দৈনন্দিন জীবনেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।

আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন (এএএ) সোমবার প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ মানের প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের জাতীয় গড় মূল্য এখন ৪ ডলারের সামান্য ওপরে অবস্থান করছে। মাত্র এক সপ্তাহ আগেও এই গড় মূল্য ছিল প্রায় ১৩ সেন্ট কম। আর গত বছরের একই সময়ে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের গড় মূল্য ছিল মাত্র ৩ দশমিক ১৪ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানির মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা ভোক্তাদের ব্যয়ও বাড়িয়ে দিয়েছে।

জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূরাজনৈতিক সংকট। গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে স্বস্তি ফিরে এসেছিল। ওই সমঝোতার লক্ষ্য ছিল উত্তেজনা কমানো এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা। সেই সময় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও কিছুটা কমে এসেছিল এবং জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতার আশা তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু সেই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানও অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আবারও অস্থির হয়ে ওঠে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল এই অঞ্চল থেকে সরবরাহ হওয়ায় যুদ্ধ বা সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিলেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৮৬ থেকে ৯১ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করেছে। অথচ চলতি জুলাই মাসের শুরুতে এই দাম ছিল প্রায় ৭২ ডলার। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে এত বড় মূল্যবৃদ্ধি বিশ্ববাজারে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণেই বাজারে এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে।

অপরিশোধিত তেল গ্যাসোলিন উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব ধীরে ধীরে খুচরা বাজারেও পড়ে। যদিও তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাম্পে গ্যাসোলিনের দাম তাৎক্ষণিকভাবে বৃদ্ধি পায় না। কারণ শোধনাগারগুলো আগে থেকেই নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল কিনে মজুত রাখে এবং সেই তেল পরিশোধন করে বাজারে সরবরাহ করতে কিছুটা সময় লাগে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন কিছুটা বিলম্বে ভোক্তাপর্যায়ে প্রতিফলিত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সব অঙ্গরাজ্যে অবশ্য গ্যাসোলিনের দাম এক নয়। স্থানীয় কর, পরিবহন ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক চাহিদার কারণে একেক রাজ্যে একেক ধরনের মূল্য দেখা যায়। এএএর তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের গড় মূল্য ছিল প্রায় ৫ দশমিক ৫০ ডলার, যা দেশটির মধ্যে সর্বোচ্চ। হাওয়াইয়ে এই মূল্য ছিল ৫ দশমিক ৪২ ডলার এবং ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে ৫ দশমিক ০১ ডলার। অন্যদিকে ইন্ডিয়ানায় প্রতি গ্যালনের গড় মূল্য ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৩৫ ডলার এবং মিসিসিপিতে প্রায় ৩ দশমিক ৫৭ ডলার।

গত কয়েক মাস ধরেই বিশ্ব জ্বালানি বাজার অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। মার্চ মাসে একপর্যায়ে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছায়। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের মূল্যও দ্রুত বেড়ে যায়। মে মাসে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের জাতীয় গড় মূল্য ৪ দশমিক ৫০ ডলারের বেশি হয়ে চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় চলতি মাসের শুরুতে জাতীয় গড় মূল্য ৩ দশমিক ৭৯ ডলারে নেমে আসে। তবে নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ায় সেই স্বস্তি আবারও শেষ হয়ে গেছে।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। শিকাগোর বাসিন্দা লিটজা মাভরোথালাসিটিস সংবাদমাধ্যমকে বলেন, গাড়িতে জ্বালানি নিতে এসে আবারও মূল্যবৃদ্ধি দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছেন। তাঁর ধারণা ছিল পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে, কিন্তু নতুন করে দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিবারের মাসিক ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে।

একই শহরের আরেক বাসিন্দা জ্যাকব ফিশার বলেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পেছনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাকে হতাশ করেছে। তাঁর মতে, চলমান সংঘাতের কারণে সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। তিনি মনে করেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়বে।

হোয়াইট হাউসও পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে একাধিকবার কম জ্বালানি মূল্যের গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন। গত মাসেও তিনি মন্তব্য করেছিলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও সেই অনুপাতে গ্যাসোলিনের দাম কমছে না, যা তাঁর জন্য হতাশাজনক। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি উদ্যোগ কার্যত ভেঙে পড়ায় জ্বালানি বাজারে আবারও অস্থিরতা ফিরে এসেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু পরিবহন ব্যয়ই বাড়ায় না, এর প্রভাব খাদ্যপণ্য, শিল্প উৎপাদন এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়ে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এটি ভোক্তা আস্থা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যদি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয় বা হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন ব্যাহত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানির মূল্য আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের গতিপ্রকৃতি অনেকটাই নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত