পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধ আইনের দাবিতে হাইকোর্টে রিট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৭ বার
পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধ আইনের দাবিতে হাইকোর্টে রিট

প্রকাশ: ২১ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সমাজে প্রচলিত জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্য নিরসন, আইনের দৃষ্টিতে প্রকৃত সমতা প্রতিষ্ঠা এবং বিদ্যমান বিভিন্ন পারিবারিক ও বিশেষ আইনি বিধানের অপব্যবহার রোধ করার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী আইনি লড়াইয়ের সূচনা হলো আজ। দেশের উচ্চ আদালতে ‘পুরুষ নির্যাতন দমন ও প্রতিরোধ আইন’ নামে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও স্বতন্ত্র আইন প্রণয়ন করার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা চেয়ে মহামান্য হাইকোর্টে একটি চাঞ্চল্যকর ও সুদূরপ্রসারী রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছে। বর্তমান সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় পারিবারিক বিরোধ, মিথ্যা মামলার জেরে পুরুষদের সামাজিক হেনস্তা ও আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দায়ের হওয়া এই রিট আবেদনটি মঙ্গলবার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিচারপতি রাজিক আল জলিলের নেতৃত্বাধীন দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চের দৈনন্দিন কার্যতালিকার শীর্ষে শুনানির জন্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন মহলে এই রিট আবেদনটি নিয়ে ইতোমধ্যে তীব্র আলোচনা, চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং পক্ষে-বিপক্ষে নানা ধরনের যুক্তিতর্কের ঝড় বইতে শুরু করেছে, যা আগামী দিনে দেশের পারিবারিক ও ফৌজদারি আইনি কাঠামোর গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে এক বিশাল প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিজ্ঞ আইনজীবীরা মনে করছেন।

সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী কাজী ইলিয়াসুর রহমান জনস্বার্থের এই রিট আবেদনটি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে হাইকোর্টে দায়ের করেছেন। রিটের আইনি কার্যপরিধি ও গণ্ডি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী হওয়ায় এতে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিভাগ ও মন্ত্রণালয়কে বিবাদী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই রিট মামলায় সুনির্দিষ্টভাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সচিবকে প্রধান বিবাদী করা হয়েছে। রিট আবেদনে অত্যন্ত জোরালোভাবে এই মর্মে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে যে, বর্তমান সময়ে সমাজে প্রচলিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’ এবং যৌতুক নিরোধ আইনের বিভিন্ন ধারা অনেক সময় ব্যক্তিগত ক্ষোভ মেটানোর উদ্দেশ্যে বা অপব্যবহারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই ধরনের আইনের অপব্যবহারের কারণে অনেক সময় দেশের নিরীহ ও সাধারণ পুরুষসমাজ বিনা অপরাধে সামাজিক হেনস্তা, অমর্যাদা, আর্থিক ক্ষতি এবং চরম মানসিক ট্রমার শিকার হচ্ছেন। আইনের দৃষ্টিতে সকলের সমান অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার স্বার্থেই নারীদের সুরক্ষামূলক আইনের অপব্যবহার রোধ করা জরুরি এবং পাশাপাশি পুরুষদের আইনি সুরক্ষা প্রদানের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ আইন থাকা অপরিহার্য।

রিট আবেদনে স্পষ্টভাবে দাবি করা হয়েছে যে, বর্তমান সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ‘পুরুষ নির্যাতন দমন ও প্রতিরোধ আইন’ নামে একটি নতুন ও স্বতন্ত্র আইন প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি। রিটকারী আইনজীবী আদালতকে বিষয়টি বোঝাতে গিয়ে বলেন যে, বিদ্যমান আইনে নারীদের সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত কঠোর বিধান রয়েছে, যা সমাজ থেকে নারী নির্যাতন কমানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। তবে এর পাশাপাশি এই আইনের কিছু ফাঁকফোকর বা অপপ্রয়োগের সুযোগ নিয়ে মুষ্টিমেয় কিছু ক্ষেত্রে নির্দোষ পুরুষদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা প্রকারান্তরে প্রকৃত নির্যাতিত নারীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথকেও অনেক সময় দীর্ঘায়িত ও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। এই ধরনের অপ্রয়োজনীয় ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি থেকে পুরুষদের আইনিভাবে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় তরফ থেকে কার্যকর কোনো বিশেষ আইন বা সুরক্ষা বলয় এতদিন পর্যন্ত তৈরি করা হয়নি। ফলশ্রুতিতে বহু পুরুষ পরিবার ও সমাজে চরম মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন এবং আত্মসম্মান রক্ষার লড়াইয়ে তারা এক প্রকার নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছেন।

এই রিট আবেদনে বিবাদীদের চরম নিষ্ক্রিয়তা এবং ব্যর্থতাকে চ্যালেঞ্জ করে একটি বড় আইনি প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে। রিটে জানতে চাওয়া হয়েছে যে, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’ কিংবা প্রচলিত ‘যৌতুক আইন’-এর অপব্যবহারের মাধ্যমে পুরুষদের অপ্রয়োজনীয় হয়রানি ও মানসিক যন্ত্রণা থেকে রক্ষা করার জন্য নতুন কোনো আইন প্রণয়নে বিবাদীদের বর্তমান নিষ্ক্রিয়তা এবং ব্যর্থতা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত এবং আইনগতভাবে সম্পূর্ণ অকার্যকর ঘোষণা করা হবে না। একই সঙ্গে, বিদ্যমান এই সামাজিক বৈষম্য ও আইনি জটিলতা দূর করার লক্ষ্যে কেন বিবাদীদের পক্ষ থেকে ‘পুরুষ নির্যাতন দমন ও প্রতিরোধ আইন’ নামে একটি নতুন ও যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করার জন্য আনুষ্ঠানিক নির্দেশ দেওয়া হবে না—এই মর্মে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে একটি কার্যকরে রুল জারির জোরালো আর্জি জানানো হয়েছে। রিটের প্রাথমিক শুনানি চলাকালীন রুল জারির অপেক্ষমাণ সময়ের মধ্যে এই আইনের অপব্যবহারের কারণে যাতে কোনো পুরুষকে যেন আর অহেতুক ও অপ্রয়োজনীয় হয়রানির শিকার হতে না হয়, সে বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন কোনো বিশেষ আদেশ দেওয়ার জন্যও আদালতে বিনীত প্রার্থনা জানানো হয়েছে।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশ এবং আধুনিক সমাজব্যবস্থায় নারী ও পুরুষ উভয়ের সমান অধিকার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় থাকাই টেকসই শান্তির মূল শর্ত। অপরাধের ক্ষেত্রে জেন্ডার বা লিঙ্গভিত্তিক পরিচয় বিচার না করে অপরাধীর বিচার হওয়াই ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত। দেশের সাধারণ বিচারপ্রার্থী মানুষেরাও মনে করেন যে, যেকোনো অপরাধের সঠিক তদন্ত হওয়া দরকার এবং মিথ্যা মামলার মাধ্যমে যেন কোনো নিরীহ নাগরিককে সামাজিক ও মানসিকভাবে ধ্বংস করে দেওয়া না হয়। হাইকোর্টের এই বেঞ্চে রিটটির শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই সাধারণ মানুষ এবং আইনাঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন যে আদালত এই সংবেদনশীল বিষয়ে কী ধরনের পর্যবেক্ষণ বা নির্দেশনা প্রদান করেন। দেশের আইনি ইতিহাসে পুরুষদের সুরক্ষা এবং সমতার প্রশ্নটিকে সামনে রেখে দায়ের হওয়া এই রিট আবেদনটি আগামী দিনে পারিবারিক আইন সংস্কার এবং জেন্ডার সমতার বিতর্কে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে সকলে একবাক্যে স্বীকার করছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত