প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ দেড় দশকের ব্যবধানে বাংলাদেশের মানুষের প্রাত্যহিক আর্থিক লেনদেন এবং জীবনযাপনের চেনা ছকটিকে একেবারে আমূল বদলে দিয়েছে দেশের মোবাইল আর্থিক সেবার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী নাম ‘বিকাশ’। ২০১১ সালের একুশে জুলাই ব্র্যাক ব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানি ইন মোশনের যৌথ উদ্যোগে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে যাত্রা শুরু করা এই ফিনটেক বা আর্থিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটি আজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে এক অনন্য অর্থনৈতিক বিপ্লবের সূচনা করেছে। পথচলার ১৫ বছর পূর্ণ করে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে প্রায় আট কোটি ৪০ লাখ নিবন্ধিত গ্রাহকের এক বিশাল পরিবারে পরিণত হয়েছে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। শুরুর দিনগুলোতে মাত্র ৩৭ জন কর্মী এবং ক্যাশ-ইন, ক্যাশ-আউট ও সেন্ড মানি—এই মাত্র তিনটি মৌলিক সেবা নিয়ে কার্যক্রম শুরু করলেও আজ তা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। বর্তমান সময়ে প্রতি সেকেন্ডে গড়ে প্রায় ২৭৭ বার এবং প্রতি মিনিটে দুই কোটি টাকারও বেশি অর্থ লেনদেন সংঘটিত হওয়ার মধ্য দিয়ে বিকাশ আজ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাতের এক অবিচ্ছেদ্য ও অত্যন্ত শক্তিশালী চালিকাশক্তিতে রূপ নিয়েছে, যা সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয় ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্থাপন করেছে।
দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ব্যাংকিং খাতের প্রথাগত ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়ে বিকাশ আজ এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে যেখানে দেশের একক কোনো ব্যাংক বা বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এই বিশাল গ্রাহক সংখ্যার অর্ধেকও অর্জন করা সম্ভব হয়নি। দেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকের গ্রাহক সংখ্যা যেখানে মাত্র তিন কোটির কিছু বেশি, সেখানে বিকাশের গ্রাহক সংখ্যা তাদের দ্বিগুণেরও বেশি ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি দেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনের গ্রাহক সংখ্যার সঙ্গে তুলনা করলেও দেখা যায় যে মুঠোফোনের ক্ষেত্রে গ্রাহকরা একাধিক সিম ব্যবহারের সুযোগ পেলেও বিকাশের প্রতিটি হিসাব সম্পূর্ণ ইউনিক বা একক। অর্থাৎ একটিমাত্র জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে কেবল একটি হিসাবই খোলা সম্ভব, সেই হিসেবে ইউনিক গ্রাহক বা প্রকৃত ব্যবহারকারীর দিক থেকেও বিকাশ টেলিকম খাতের এই শীর্ষ জায়ান্টকেও পেছনে ফেলে এক অনন্য রেকর্ড গড়েছে। শহর থেকে শুরু করে একেবারে দুর্গম গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ, ধনী থেকে শুরু করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, ব্যক্তি থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে—সব শ্রেণির মানুষের দৈনন্দিন জীবনাচারণে নগদ টাকার একটি আধুনিক ও নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বিকাশ আজ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের আর্থিক স্বাধীনতা অর্জনের পথকে অত্যন্ত সুগম করেছে।
প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে বিকাশ কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান বদলে দিয়েছে তার চমৎকার চিত্র ফুটে ওঠে এর বহুমুখী সেবাসমূহের বিস্তৃতির মধ্যে। একসময় যখন মুঠোফোনে টাকা পাঠানো ছিল এক অকল্পনীয় ও অবিশ্বাস্য ধারণা, তখন এ দেশের সাধারণ মানুষকে আর্থিক লেনদেনের জন্য কুরিয়ার সেবা, ডাকঘর কিংবা ব্যাংকের দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। কিন্তু বর্তমানে বিকাশের মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে দুই শতাধিক ভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় সেবা খুব সহজেই ঘরে বসে গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে, যার কারণে এটি আজ দেশের প্রধান ‘সুপার অ্যাপ’-এ রূপান্তরিত হয়েছে। শুধু সাধারণ অর্থ পাঠানো বা গ্রহণের মধ্যেই এই সেবা সীমাবদ্ধ নেই; বরং অ্যাপের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ও যোগ্য গ্রাহকরা কোনো জামানত ছাড়াই অতি সহজে তাৎক্ষণিক ক্ষুদ্রঋণ পাওয়ার সুবিধা ভোগ করছেন। এই যুগান্তকারী ঋণসেবা চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত দেশের প্রায় ৩৫ লাখ গ্রাহক সম্মিলিতভাবে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণ করেছেন এবং বর্তমানে গড়ে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ মানুষ এই ডিজিটাল ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন। এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষ অ্যাপের মাধ্যমেই অত্যন্ত নিরাপদে নিজেদের পছন্দমতো ডিপিএস ও সঞ্চয় হিসাব খুলতে পারছেন, যার ফলে ইতিমধ্যে প্রায় ৭০ লাখ গ্রাহক বিকাশের মাধ্যমে সঞ্চয়ের সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন।
দেশীয় জনবল এবং মেধার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটি আজ বিশ্বমানের একটি স্বাবলম্বী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যার পেছনে কাজ করেছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বেশ কয়েকটি বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানের বিশাল বিনিয়োগ ও সহযোগিতা। বর্তমানে বিকাশের গর্বিত মালিকানাধীন অংশীদারদের তালিকায় রয়েছে বিশ্বব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন বা আইএফসি, যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, চীনের আলিবাবা গ্রুপের মালিকানাধীন আন্তর্জাতিক পেমেন্ট প্রতিষ্ঠান অ্যান্ট ইন্টারন্যাশনাল এবং জাপানের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সফটব্যাংক। প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের সর্বমোট বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশের ফিনটেক খাতের প্রতি বিশ্ববাসীর অগাধ আস্থা ও বিশ্বাসের এক সুদৃঢ় প্রমাণ। দেশের আনাচকানাচে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার এজেন্ট অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ‘হিউম্যান এটিএম’ হিসেবে কাজ করে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নগদ অর্থ পৌঁছে দিচ্ছেন। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিট্যান্স এবং বড় শহরগুলোর উপার্জিত অর্থ মুহূর্তের মধ্যে একেবারে গ্রামের বাড়িতে থাকা পরিবারের কাছে পৌঁছে যাওয়ার মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি আজ আগের তুলনায় অনেক বেশি গতিশীল ও চাঙা হয়ে উঠেছে।
দেশের তৈরি পোশাক বা প্রস্তুতকারক খাতের প্রায় ১ হাজার ৩০০ স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার শ্রমিক এখন প্রতি মাসে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তার সঙ্গে বিকাশের মাধ্যমেই তাদের মাসিক বেতন গ্রহণ করছেন, যার মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই নারী শ্রমিক হওয়ায় নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ত্বরান্বিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর নানা ধরনের ভাতা ও সহায়তা সরাসরি উপকারভোগীদের বিকাশ হিসাবে পৌঁছে যাওয়ার ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ হয়েছে এবং দুর্নীতিমুক্ত উপায়ে সরকারি সহায়তা বিতরণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট ব্যাংকার আনিস এ খান অত্যন্ত ইতিবাচক মূল্যায়ন করে জানিয়েছেন যে, একজন সাধারণ রিকশাচালক দিনভর হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে সন্ধ্যায় তার অর্জিত অর্থ পরিবারের কাছে নিরাপদে পাঠাতে পারছেন, যা মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বিপ্লব ঘটিয়েছে। অন্যদিকে দেশের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনুসর এই খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে মতামত ব্যক্ত করে বলেছেন যে, বিগত ১৫ বছরে এমএফএস খাতে বিকাশ অত্যন্ত অসামান্য সাফল্য অর্জন করলেও সামগ্রিক খাতটিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করার জন্য আরও কয়েকটি সমমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রয়োজন ছিল। পাশাপাশি নগদ লেনদেনের ওপর থেকে নির্ভরতা কমিয়ে মার্চেন্ট পেমেন্ট বা ক্যাশলেস সমাজ গঠনে বিকাশকে এখন আরও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে।