স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নতুন বিধি আনছে ইসি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬
  • ৩০ বার
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নতুন বিধি আনছে ইসি

প্রকাশ:  ২১ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক অঙ্গন ও নির্বাচন ব্যবস্থায় এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাদের অংশগ্রহণ সরাসরি নিষিদ্ধ করার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে নির্বাচন কমিশন বা ইসি। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্টভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো যেহেতু সম্পূর্ণরূপে নির্দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তাই প্রচলিত আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের পদধারী বা নেতাকর্মীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত রাখার বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করার কোনো আইনগত এখতিয়ার ইসির হাতে নেই। বর্তমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনে যোগ্যতার নির্ধারিত শর্তগুলো পূরণ সাপেক্ষে যেকোনো নাগরিক স্বাধীনভাবে প্রার্থী হওয়ার অধিকার রাখেন এবং সেখানে প্রার্থীর দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা দেখার কোনো সুযোগ ইসির নেই বলে স্পষ্ট করা হয়েছে। তবে দলীয় নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণের ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা জারির প্রস্তাব নাকচ করা হলেও জাতীয় সংসদের মতো স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনগুলোতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে এবং অপরাধ ও অনিয়ম কঠোরভাবে দমনের লক্ষ্যে দ্বৈত নাগরিকত্বধারী ব্যক্তি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত আসামিদের প্রার্থী হওয়ার পথ চিরতরে বন্ধ করার চূড়ান্ত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্যভাবে জানা গেছে যে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর আইন ও বিধিমালা যুগোপযোগী এবং আরও বেশি কার্যকার করার জন্য বেশ কিছু কঠোর ও দূরদর্শী সংশোধনী প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে আজ মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে কমিশন সভায় বসার কথা রয়েছে। সকাল ১১টায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সভাপতিত্বে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদ—এই স্থানীয় সরকারের পাঁচটি স্তরের নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রণীত আইন ও বিধিমালা সংশোধনীর চূড়ান্ত রূপরেখা অনুমোদিত হবে। এর আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং প্রধান অংশীজনদের পক্ষ থেকে খসড়া আচরণবিধিমালার ওপর তাদের সুনির্দিষ্ট মতামত প্রদান করা হয়েছিল, যার মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের স্থানীয় নির্বাচনে যেকোনো ধরনের প্রার্থী হওয়া থেকে বিরত রাখতে কঠোর আইনি বিধান যুক্ত করার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সংবিধান ও প্রচলিত নির্বাচনী আইনের পরিধি ব্যাখ্যা করে সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, নির্দলীয় কাঠামোর এই নির্বাচনে রাজনৈতিক পরিচয়ভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা আইনিভাবে সম্ভব নয়, তবে অপরাধ ও অন্যান্য নৈতিক স্খলনের দায়ে অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে।

ইসি সূত্রে আরও জানা গেছে যে, জামায়াতে ইসলামীর ওই প্রস্তাব সরাসরি গৃহীত না হলেও বিগত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনুসৃত কঠোর নীতিমালার আদলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও চার ক্যাটাগরির বিতর্কিত ও অভিযুক্ত ব্যক্তির প্রার্থিতা আইনগতভাবে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। প্রথমত, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বা আইসিটি আইনের নির্দিষ্ট ধারা অনুযায়ী ইতিমধ্যেই যেসব ব্যক্তি বা আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্র বা চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে, তারা স্থানীয় সরকারের কোনো নির্বাচনেই প্রার্থী হতে পারবেন না। আইসিটি আইনের ২০সি ধারার বিধানটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যুক্ত না থাকায় আইনি ফাঁকফোকর তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল, যা দূর করতেই এই কঠোর বিধানটি যুক্ত করা হচ্ছে। তবে কোনো ব্যক্তি যদি পরবর্তীতে ট্রাইব্যুনাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অব্যাহতি কিংবা নির্দোষ হিসেবে খালাস পান, কেবল তখনই তার ওপর থেকে এই অযোগ্যতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রত্যাহার বলে গণ্য হবে। দ্বিতীয়ত, দ্বৈত নাগরিকত্বধারী কোনো ব্যক্তিও আর স্থানীয় সরকারের কোনো নির্বাচনে মেয়র, চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর বা সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। কমিশন অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে মনে করে যে, অন্য কোনো রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিক আনুগত্য পোষণকারী কোনো ব্যক্তি দেশের স্থানীয় বা জাতীয় কোনো জনপ্রতিনিধি হওয়ার ন্যূনতম নৈতিক যোগ্যতা রাখেন না। সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের বা আরপিওর ১২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই বিধানটি সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও কঠোরভাবে কার্যকর করার জন্য সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পাঠানোর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

তৃতীয়ত, স্থানীয় নির্বাচনে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তারকারী ঋণখেলাপিদের দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ করতে ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের অংশীদার পরিচালক এবং ঋণখেলাপির জামিনদারদেরও নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করার অত্যন্ত কঠোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনের বিভিন্ন ফাঁকফোকর গলে ঋণখেলাপিদের কেউ কেউ পার পেয়ে গেলেও স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রে এই ধরনের কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতির ছিটেফোঁটাও যাতে অবশিষ্ট না থাকে, সেজন্য এই বিধানটিকে আরও অনেক বেশি শক্ত ও কঠোর করার লক্ষ্যেই ইসি এই উদ্যোগ নিয়েছে। চতুর্থত, এমপিওভুক্ত স্কুল ও কলেজের শিক্ষকরা যাতে আর কোনোভাবেই সরাসরি রাজনৈতিক বা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারেন, সেই বিষয়েও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। ইসি মনে করে যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা যদি সরাসরি নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে পড়েন, তবে সাধারণ শিক্ষক সমাজের নিরপেক্ষতা এবং পেশাগত মর্যাদা নিয়ে যেমন জনমনে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে, তেমনি বিজয়ী হওয়ার পর ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক শিক্ষা কার্যক্রমেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই এমপিওভুক্ত শিক্ষকগণ যদি স্থানীয় সরকারের কোনো পদে নির্বাচন করতে ইচ্ছুক হন, তবে তাদেরকে অবশ্যই নিজ পেশার শিক্ষকতা চাকরি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করার শর্ত পূরণ করতে হবে।

প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতার পাশাপাশি নির্বাচন পরিচালনার দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি জটিলতা চিরতরে নিরসন করার জন্য বিচারিক প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব আনছে নির্বাচন কমিশন। বর্তমান বিধান অনুযায়ী নির্বাচনী আপিল ট্রাইব্যুনালগুলো একজন উচ্চ আদালতের বিচারক এবং একজন বিচার বিভাগীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তার সমন্বয়ে দুই সদস্যবিশিষ্ট গঠিত হয়ে থাকে। কিন্তু প্রায় সময়ই দেখা যায় যে, দুই সদস্যের এই ট্রাইব্যুনালে কোনো রায় বা সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে বিচারক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা উভয়ের মধ্যে দ্বিমত বা মতপার্থক্য দেখা দেয়। এই ধরনের মতপার্থক্যের ফলে সংক্ষুব্ধ প্রার্থীকে আইনগত জটিলতা এড়াতে সুপ্রিম কোর্টের তৃতীয় কোনো বেঞ্চ বা উচ্চতর আদালতে শরণাপন্ন হতে হয়, যার ফলে নির্বাচন-সংক্রান্ত বিরোধ বা আপিল নিষ্পত্তি করতে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর সময় অপচয় হয় এবং পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াটি এক ধরনের স্থবিরতার মুখে পড়ে। এই অনভিপ্রেত দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি জটিলতা চিরতরে এড়ানোর উদ্দেশ্যে ইসি এখন বিদ্যমান দুই সদস্যের ট্রাইব্যুনাল ভেঙে দিয়ে কেবলমাত্র উচ্চ আদালতের একজন মাত্র বিচারপতির নেতৃত্বে অত্যন্ত ক্ষমতাধর ও কার্যকর এক সদস্যের নির্বাচনী আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠনের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উত্থাপন করতে যাচ্ছে।

আইন ও বিধিমালা সংশোধনের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের পাশাপাশি স্থানীয় সরকারের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনী আচরণবিধিমালার আধুনিক খসড়াও আজকের কমিশন সভায় বিস্তারিত আলোচনার পর চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করার কথা রয়েছে। যেহেতু আচরণবিধিমালা সংশোধন করার পূর্ণ ও একচ্ছত্র এখতিয়ার সম্পূর্ণভাবে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব সীমার মধ্যে পড়ে, তাই এই বিধিমালা চূড়ান্ত করার জন্য সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের কোনো প্রয়োজন পড়বে না। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রচলিত ও সংজ্ঞায়িত পরিভাষার ভেতরে দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবও ইসির বিবেচনায় রয়েছে, যাতে স্থানীয় সরকারের যেকোনো স্তরের নির্বাচনে উদ্ভূত চরম আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা সহিংসতা কঠোরভাবে মোকাবিলা করার প্রয়োজনে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে যুক্ত করার আইনি সুযোগ উন্মুক্ত থাকে। তবে অহেতুক বা অপ্রয়োজনীয় পরিস্থিতিতে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন না করার পক্ষপাতী ইসি। পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে মোট ভোটারের এক শতাংশের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর জমা দেওয়ার ঐতিহ্যগত বিধান বাতিল করা, জামানতের পরিমাণ যৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি করা এবং প্রার্থীরা যদি তাদের দাখিলকৃত হলফনামায় ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান করেন, তবে তা প্রমাণিত হওয়ামাত্র সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর মনোনয়নপত্র অবিলম্বে বাতিলের মতো কঠোর বিধানও এই নতুন খসড়ায় যুক্ত করার জোরালো প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত