প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ডিজিটাল প্রযুক্তির অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রাকে কোনোভাবেই ভয় পেয়ে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয় উল্লেখ করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেছেন যে, প্রযুক্তিকে সমাজ থেকে দূরে সরিয়ে না রেখে বরং একে অত্যন্ত নিরাপদ, দায়িত্বশীল ও ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করার উপযুক্ত মাধ্যম হিসেবে আগামী প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে। মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকার গুলশানের একটি অভিজাত হোটেল লেকশোরে বিখ্যাত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও উন্নয়ন সংস্থা বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন আয়োজিত ‘ডিজিটাল জেন্ডার নরমস’ বা ডিজিটাল পরিসরে লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক মানদণ্ড শীর্ষক জাতীয় শিখন-অভিজ্ঞতা বিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির মহামূল্যবান আসন অলংকৃত করে তিনি এই সুদূরপ্রসারী ও সময়োপযোগী মন্তব্য করেন। বর্তমান যুগের শিশু-কিশোর ও তরুণ সমাজকে আধুনিক প্রযুক্তির সুফলগুলো থেকে বঞ্চিত না করে বরং এর সঠিক ও নিরাপদ ব্যবহার শেখানোর ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন যে, প্রযুক্তির হাত ধরে বিশ্ব এগিয়ে চলেছে এবং এর এই গতিপ্রকৃতি কোনো অবস্থাতেই থমকে থাকবে না, তাই যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য আমাদের সন্তানদের এখনই ভবিষ্যতের উপযোগী করে প্রস্তুত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে তার সুদীর্ঘ ও প্রাণবন্ত বক্তব্যে বিগত ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতির কথা স্মরণ করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বলেন যে, সেই উত্তাল দিনগুলোতে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দিয়ে আপামর জনসাধারণের গণতান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ও ক্ষোভকে রোধ করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল, কিন্তু সরকারের সেই হঠকারী ও অগণতান্ত্রিক চেষ্টা শেষ পর্যন্ত বিন্দুমাত্র সফল হয়নি। বরং সেই চরম বাস্তবধর্মী অভিজ্ঞতা আমাদের চোখের সামনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে দিয়েছে যে, ডিজিটাল মাধ্যম ও ইন্টারনেটভিত্তিক প্রযুক্তি আজ আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র এবং দৈনন্দিন নাগরিক জীবনের এমন এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে, যাকে অস্বীকার করার বা মুছে ফেলার কোনো অবকাশ নেই। তাই প্রযুক্তিকে অন্ধের মতো অস্বীকার করার মানসিকতা বর্জন করে এর সঠিক ও সুশৃঙ্খল ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় সক্ষমতা গড়ে তোলাটাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ এবং আমাদের সমাজকাঠামোতে প্রচলিত দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের মাঝে যে একটি দৃশ্যমান ও স্পষ্ট অসামঞ্জস্য বা ব্যবধান তৈরি হয়েছে, সেই সংকট উত্তরণের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
বর্তমান ডিজিটাল দুনিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ বিস্তার এবং এর অপব্যবহারের ফলে সমাজে যে ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, সে বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ববি হাজ্জাজ বলেন যে, ইন্টারনেটে ভুয়া ছবি, বিকৃত ভিডিও তৈরি, চরিত্রহনন এবং নানান ধরনের সাইবার বা ডিজিটাল হয়রানির ঘটনা এখন অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে সমাজের সম্মানিত নারীসমাজ, কিশোরী এবং রাজনীতিতে সক্রিয় নারীনেত্রীরা এই ধরনের অপতৎপরতা ও সাইবার সহিংসতার সবচেয়ে বড় এবং নিয়মিত শিকারে পরিণত হচ্ছেন, যা কোনোভাবেই একটি সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। এই ধরনের অপকর্ম শক্ত হাতে দমন করার জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং শিশু ও নারীদের সাইবার নিরাপত্তা রক্ষায় আরও অধিক কার্যকর আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের সবচেয়ে তীব্র দাবি। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার প্রযুক্তি ব্যবহারের নামে সমাজে কোনো ধরনের অযৌক্তিক ও অনভিপ্রেত বাধা সৃষ্টি করতে চায় না, বরং ডিজিটাল স্বাধীনতা এবং সাধারণ নাগরিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার মাঝে একটি সূক্ষ্ম ও ভারসাম্যপূর্ণ মেলবন্ধন প্রতিষ্ঠা করাই সরকারের মূল লক্ষ্য বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং আধুনিক যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের বহুমুখী দূরদর্শী পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী জানান যে, দেশের সামগ্রিক প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় ভ্যালু-বেইজড এডুকেশন বা নৈতিকতাভিত্তিক শিক্ষা, ডিজিটাল সেফটি বা অনলাইন নিরাপত্তা, জীবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতা, জেন্ডার সংবেদনশীলতা এবং দায়িত্বশীল নাগরিক মূল্যবোধকে নতুন পাঠ্যক্রমের একটি অন্যতম ও অপরিহার্য অংশ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এই মহৎ উদ্যোগকে সফল করে তোলার জন্য দেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদ, দেশি-বিদেশি গবেষক এবং ইউনেস্কোসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিবিড় ও সমন্বিতভাবে কাজ করে চলেছে তার মন্ত্রণালয়। নতুন ও আধুনিক এই শিক্ষাব্যবস্থার আওতায় দেশের সাধারণ শিক্ষক ও কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিনর্ভর শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ সুযোগের আওতায় নিয়ে আসার জন্য ধাপে ধাপে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে আকর্ষণীয় ও ইন্টারঅ্যাকটিভ ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। এর অংশ হিসেবে খুব শীঘ্রই শিক্ষকদের হাতে ট্যাব এবং অদূর ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের হাতেও শিক্ষাবান্ধব ডিজিটাল ডিভাইস বা আধুনিক গ্যাজেট তুলে দেওয়ার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে সরকার কাজ করছে বলে তিনি অত্যন্ত আশাবাদী সুরে জানান।
শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নিরাপদ বিকাশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব কেবল একা পিতা-মাতার নয়, বরং এটি সমগ্র সমাজ ও রাষ্ট্রের যৌথ পবিত্র দায়িত্ব বলে মন্তব্য করে ববি হাজ্জাজ বলেন যে, এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য দেশের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কমিউনিটি বা স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের স্কুলগুলোতে শিশুদের পুষ্টিকর স্কুল মিল কার্যক্রম অত্যন্ত সফলভাবে তদারকি করার জন্য দায়িত্বশীল অভিভাবক কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও অভিভাবক ও স্থানীয় জনগণকে যুক্ত করার উদ্যোগ ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় বিভিন্ন এনজিও এবং উন্নয়ন সহযোগীদের উদ্দেশে তিনি অত্যন্ত উন্মুক্ত ও আন্তরিক আহ্বান জানিয়ে বলেন যে, শিক্ষার্থীদের সার্বিক কল্যাণে যেসব কার্যকরী ও পরীক্ষিত উদ্যোগ বা প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হবে, বর্তমান সরকার তা অত্যন্ত সাদরে গ্রহণ করতে এবং এর পরিধি সারাদেশে বিস্তৃত করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। বর্তমান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পূর্ণ ওপেন-ডোর নীতি বা উন্মুক্ত দরজা নীতিতে কাজ করে যাচ্ছে, তাই যেকোনো ভালো ও ফলপ্রসূ প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে আসার জন্য তিনি সবার প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।
সমাজের মূল স্রোতে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার প্রসঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন যে, কেবল লোক দেখানো বা মুখের স্লোগানে নারী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, বরং এর জন্য শিশুর শৈশবকাল থেকেই সমাজের প্রতিটি স্তরে সমান সুযোগ, সমান অধিকার, সম্পূর্ণ নিরাপদ পরিবেশ এবং অদম্য আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার উপযুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রথম সোপান থেকেই এই ইতিবাচক পরিবর্তনের শক্ত ভিত্তি তৈরি করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন যে, আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ এবং তাদের হাত ধরেই বাংলাদেশ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিগণ, খুলনা ও সাভার অঞ্চলের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকসমাজ, উৎসুক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকবৃন্দ, ইউএন উইমেন, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল, জাগো ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন খ্যাতিমান এনজিওর উর্ধ্বতন প্রতিনিধিরা এবং দেশের প্রথম সারির বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানটিকে প্রাণবন্ত করে তোলেন। সরকারের এই যুগান্তকারী চিন্তাভাবনা ও দিকনির্দেশনা আগামী দিনে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এক বিশাল বিপ্লব ঘটাবে বলে অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ আশাবাদ ব্যক্ত করেন।