প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ক্রিকেট সম্পর্ক গত এক বছরে নানা কারণে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। কূটনৈতিক টানাপোড়েন, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং দ্বিপক্ষীয় ক্রিকেট সূচিতে অনিশ্চয়তার কারণে দুই দেশের ক্রিকেটীয় যোগাযোগে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল। তবে সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে সম্পর্ককে আবারও স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। তার মতে, আগামী সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ সফরে ভারতের জাতীয় ক্রিকেট দলের সম্ভাব্য সিরিজটি শুধু একটি ক্রিকেট প্রতিযোগিতাই নয়, বরং দুই দেশের ক্রীড়া কূটনীতিকে নতুন গতি দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) রাজধানীর মিরপুরে সুইমিং কমপ্লেক্সে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর কার্যক্রম পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার ক্রীড়া কূটনীতিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রিকেটের অবস্থান এখন অনেক সুদৃঢ়। তাই অতীতের কিছু ঘটনার কারণে যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উভয় দেশের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
আমিনুল হক জানান, ভারতীয় দূতাবাসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার আলোচনা হয়েছে এবং দুই পক্ষই সেপ্টেম্বরে নির্ধারিত সিরিজটি আয়োজনের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতীয় দল বাংলাদেশ সফরে এলে সেটি শুধু ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য আনন্দের খবরই হবে না, বরং দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতারও প্রতীক হয়ে উঠবে।
সূচি অনুযায়ী, ভারতের জাতীয় ক্রিকেট দলের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ সফরে এসে তিনটি ওয়ানডে ও তিনটি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার কথা রয়েছে। মূলত এই সিরিজটি আগের বছর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও দুই দেশের মধ্যে সৃষ্ট কূটনৈতিক উত্তেজনার কারণে তা স্থগিত করা হয়। পরবর্তীতে চলতি বছরও সিরিজটি নির্ধারিত সময়ে আয়োজন করা যাবে কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে সংশয় দেখা দেয়।
গত কয়েক মাসে দুই দেশের ক্রিকেট সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে। বিশেষ করে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টকে ঘিরে নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তের কারণে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। এর প্রভাব বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) কার্যক্রমেও পড়ে। এমনকি ভারতের বিপক্ষে সম্ভাব্য সিরিজকে সামনে রেখে মিডিয়াস্বত্ব বিক্রির কার্যক্রমও এক পর্যায়ে স্থগিত রাখা হয়। এসব ঘটনার ফলে সিরিজটি আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা নিয়ে ক্রিকেটাঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
তবে বর্তমান সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অতীতের বিরূপ অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে নষ্ট করা উচিত নয়। তিনি মনে করেন, ক্রীড়া এমন একটি ক্ষেত্র, যা রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক দূরত্ব কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুস্থ ও স্বাভাবিক ক্রীড়া সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, একটি ছোট ঘটনার কারণে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তা দীর্ঘমেয়াদে বহন করার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে আস্থা ও বন্ধুত্ব আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। তার মতে, ক্রিকেট দুই দেশের জনগণের আবেগের অন্যতম বড় জায়গা। ফলে মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও মাঠের বাইরের সম্পর্ক সহযোগিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতেই এগিয়ে নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশ ও ভারতের ক্রিকেট প্রতিদ্বন্দ্বিতা গত এক দশকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। দুই দেশের মধ্যকার ম্যাচগুলো বরাবরই দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে। আইসিসির বিভিন্ন টুর্নামেন্টে একাধিক স্মরণীয় লড়াইয়ের পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সিরিজও সমানভাবে জনপ্রিয়। সে কারণে দীর্ঘ বিরতির পর ভারতীয় দলের সম্ভাব্য বাংলাদেশ সফরকে ঘিরে ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যেও বাড়ছে প্রত্যাশা।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, সিরিজটি নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠিত হলে তা শুধু দুই বোর্ডের সম্পর্ক উন্নয়নে নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ক্রীড়া সহযোগিতার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক বার্তা দেবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সূচিতে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে এবং দেশের ক্রিকেট অর্থনীতিও উপকৃত হবে।
এদিকে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী এদিন ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচির অগ্রগতির বিষয়েও কথা বলেন। তিনি জানান, দেশের তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড় খুঁজে বের করার লক্ষ্যেই এই কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। গত ২ মে সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে এই আয়োজনের উদ্বোধন করেন। এরপর মে ও জুন মাসজুড়ে উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
আগামী ২৭ জুলাই রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর সমাপনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। বিকেল চারটায় শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ডিসিপ্লিনে নির্বাচিত সেরা ক্রীড়াবিদদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত থাকবেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, একদিকে দেশের ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন ও তৃণমূল থেকে খেলোয়াড় তৈরির উদ্যোগ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্রীড়া কূটনীতিকে শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা—এই দুই দিক সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে পারলে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন আরও সমৃদ্ধ হবে। আর সেই ধারাবাহিকতায় সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট সিরিজ সফলভাবে আয়োজন করা গেলে তা দুই দেশের ক্রীড়া সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।