প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) র্যাগিংয়ের অভিযোগে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের আট শিক্ষার্থীকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। নবীন শিক্ষার্থীদের রাতভর মানসিক নির্যাতন, অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল এবং কান ধরে উঠবস করানোর অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্যাম্পাসে র্যাগিং ও শিক্ষার্থী নির্যাতনের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’ এবং তদন্তে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্টার ড. এ বি এম আজিজুর রহমান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এই শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের শৃঙ্খলা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ, ২০১৮-এর বিধান অনুযায়ী অভিযুক্তদের সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। পাশাপাশি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত অব্যাহত থাকবে এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীরা সবাই পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ৫৪তম ব্যাচের (শিক্ষাবর্ষ ২০২৪-২০২৫) শিক্ষার্থী। তারা হলেন মো. ফজলে হাসান ফাহাদ, মো. আল-আমিন হোসাইন, মো. জাহিদ হাসান, মো. ফয়সাল আহমেদ, মো. মাহমুদুল হাসান খান আকিব, মো. মাহমুদুল আমিন সিয়াম, মো. মোস্তাফিজুর রহমান এবং সৈয়দ সাকিব আহমেদ রাতুল।
অফিস আদেশে বলা হয়েছে, গত ২০ জুলাই রাত প্রায় ১০টা থেকে ভোর ৩টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক হলসংলগ্ন মনপুরা এলাকায় পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ৫৫তম ব্যাচের (শিক্ষাবর্ষ ২০২৫-২০২৬) কয়েকজন নবীন শিক্ষার্থীকে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে তাদের দীর্ঘ সময় ধরে মানসিকভাবে হেনস্তা করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, নবীনদের অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করা হয়, কান ধরে উঠবস করানো হয় এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ বিভিন্ন ধরনের অপমানজনক আচরণের শিকার হতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কর্মকাণ্ড র্যাগিংয়ের সংজ্ঞার আওতায় পড়ে এবং শিক্ষার্থীদের মর্যাদা ও নিরাপত্তার পরিপন্থী।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগের যথেষ্ট ভিত্তি পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রশাসনের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে র্যাগিংয়ের মতো ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং নতুন শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও বৈষম্যহীন পরিবেশ নিশ্চিত করা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম দায়িত্ব।
অফিস আদেশে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযুক্তদের কর্মকাণ্ড ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের শৃঙ্খলা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ, ২০১৮’-এর ৫(ঙ) ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ কারণে একই অধ্যাদেশের ৪(১)(খ) ধারা অনুযায়ী তাদের সাময়িক বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সূত্র বলছে, এ ঘটনায় শুধু বহিষ্কৃত আট শিক্ষার্থীর ভূমিকা নয়, অন্য কেউ জড়িত ছিলেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে নতুন কোনো তথ্য উঠে এলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের বক্তব্য ও সাক্ষ্য সংগ্রহের কাজও চলছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অতীতেও র্যাগিং নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিটি ঘটনার পর প্রশাসন কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিলেও নতুন করে এমন অভিযোগ সামনে আসায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, র্যাগিং কেবল শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন শিক্ষার্থীরা ভয়, অপমান ও মানসিক চাপের কারণে স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, সম্মানজনক ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। প্রতিটি বিভাগ ও আবাসিক হলে র্যাগিংবিরোধী নির্দেশনা জোরদার করা হয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী এ ধরনের ঘটনার শিকার হলে দ্রুত প্রশাসনকে জানাতে আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
শিক্ষাবিদদের মতে, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে র্যাগিংয়ের সংস্কৃতি বন্ধ করতে শুধু প্রশাসনিক শাস্তি যথেষ্ট নয়; এর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতা এবং মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলাও জরুরি। নবীনদের স্বাগত জানানোর নামে কোনো ধরনের মানসিক বা শারীরিক নির্যাতন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে নতুন শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তা ও আস্থার সঙ্গে তাদের শিক্ষাজীবন শুরু করতে পারেন।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে পুনরায় জানানো হয়েছে, র্যাগিং ও যেকোনো ধরনের শিক্ষার্থী নির্যাতনের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অব্যাহত থাকবে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী আরও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ আরও জোরদার করা হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।