শাবিপ্রবিতে শিক্ষার্থী নির্যাতনের বিচার দাবিতে টানা বিক্ষোভ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৭ বার
শাবিপ্রবিতে শিক্ষার্থী নির্যাতনের বিচার দাবিতে টানা বিক্ষোভ

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) হলের খাবারের মান নিয়ে মন্তব্য করাকে কেন্দ্র করে এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগে সৃষ্ট উত্তেজনা কাটেনি। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে টানা তৃতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিয়ে তাদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনসহ আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দুপুর সোয়া ১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বর থেকে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে একাডেমিক ভবন ‘ডি’ এক্সটেনশন এলাকা অতিক্রম করে প্রশাসনিক ভবন-১-এর সামনে গিয়ে সমাবেশে রূপ নেয়। বিক্ষোভে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অংশ নেন এবং তারা ন্যায়বিচার, নিরাপদ ক্যাম্পাস ও শিক্ষার্থীদের মর্যাদা রক্ষার দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী খাইরুল হলের খাবারের মান নিয়ে মন্তব্য করার পর তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও মারধর করা হয়। এ ঘটনায় ছাত্রদলের সদ্য বহিষ্কৃত দুই নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, ব্যক্তিগত মত প্রকাশের কারণে কোনো শিক্ষার্থীকে মারধরের শিকার হতে হবে—এমন সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলতে পারে না। তারা মনে করেন, এটি শুধু একজন শিক্ষার্থীর ওপর হামলা নয়, বরং ক্যাম্পাসে মুক্ত মত প্রকাশের পরিবেশের ওপরও আঘাত।

বিক্ষোভ চলাকালে শিক্ষার্থীরা “জাস্টিস ফর খাইরুল”, “প্রশাসন জবাব চাই”, “উই ওয়ান্ট জাস্টিস”সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। তাদের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত দ্রুত তদন্ত শেষ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া। অন্যথায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থার সংকট আরও গভীর হবে।

সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মোখলেসুর রহমান উপস্থিত হলে শিক্ষার্থীরা তাঁর কাছে তাদের উদ্বেগ তুলে ধরেন। তারা অভিযোগ করেন, অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট বিভাগের পক্ষ থেকে হামলার ঘটনাকে স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপন করে বিভিন্ন বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি অভিযুক্তদের একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষমা চেয়ে সহানুভূতি অর্জনের চেষ্টা করছেন বলেও দাবি করেন আন্দোলনকারীরা।

আন্দোলনকারীরা প্রক্টরের কাছে দাবি জানান, তদন্ত কমিটির ওপর যেন কোনো ধরনের বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ চাপ সৃষ্টি না হয় এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বক্তব্য তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে না পারে। তারা স্পষ্টভাবে বলেন, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে।

শিক্ষার্থীদের বক্তব্যের জবাবে প্রক্টর অধ্যাপক মোখলেসুর রহমান তাদের আশ্বস্ত করেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শেষের পর্যায়ে রয়েছে এবং মঙ্গলবারই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভা ডেকে তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, তদন্তের ওপর কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বক্তব্য কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা কোনো প্রভাব ফেলবে না।

এদিকে তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরে তিনি সংক্ষিপ্ত বার্তায় জানান, তিনি একটি সভায় ব্যস্ত রয়েছেন। ফলে তদন্ত প্রতিবেদন বা সম্ভাব্য প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাঁর আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পরপরই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সহনশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞানচর্চা, যুক্তি ও মতবিনিময়ের স্থান। সেখানে কোনো মতামত বা সমালোচনার কারণে সহিংসতার ঘটনা শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং নতুন শিক্ষার্থীদের মধ্যেও নেতিবাচক বার্তা দেয়। তাই এমন অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি শিক্ষার্থীদের আস্থা বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।

শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, তারা কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা চান না। তবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হতে পারে। তাদের দাবি, তদন্তের ফল প্রকাশ, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে যে, তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। এখন তদন্ত প্রতিবেদনের ওপরই নির্ভর করছে পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত