প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যয়কে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক বাজেটধারী দেশটির জন্যও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, যুদ্ধ পরিচালনা, সামরিক অভিযান, অস্ত্র মোতায়েন এবং সেনা সহায়তা বাবদ এ পর্যন্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সম্ভাব্য ব্যয়ও এই হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ চেয়েছে।
ওয়াশিংটনে কংগ্রেসের এক গুরুত্বপূর্ণ শুনানিতে পিট হেগসেথ বলেন, যুদ্ধের ব্যয় প্রতিদিন বাড়ছে এবং এটি পেন্টাগনের স্বাভাবিক বাজেট ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ না পাওয়া গেলে সামরিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সীমিত করতে হতে পারে। একই সঙ্গে যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ, সামরিক সরঞ্জাম ও অন্যান্য প্রতিরক্ষা অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণেও প্রভাব পড়বে। দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা উন্নয়নের পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর অধিকারী যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করলেও চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউক্রেন সংকট, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাত—সব মিলিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে। এর সঙ্গে ইরান যুদ্ধ যুক্ত হওয়ায় বাজেটের ভারসাম্য রক্ষা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
তবে ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যয়ের হিসাব কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে পেন্টাগন বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি। এর আগে মার্চ মাসে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, সংঘাত শুরুর মাত্র ছয় দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছিল। সেই হিসাবে কয়েক মাসের ব্যবধানে ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এই বাস্তবতায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসের কাছে প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত জরুরি তহবিল চেয়েছেন। প্রশাসনের দাবি, এই অর্থের বড় অংশ ইরান-সংঘাত পরিচালনা, সামরিক সরঞ্জাম পুনঃসংযোজন, ক্ষতিগ্রস্ত অস্ত্রভান্ডার পুনর্গঠন এবং চলমান অভিযান পরিচালনায় ব্যয় করা হবে। তবে বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান দলেরও কিছু সদস্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় যুদ্ধ ব্যয় এখন রাজনৈতিক ইস্যুতেও পরিণত হয়েছে। বিরোধী নেতাদের অভিযোগ, প্রশাসন যুদ্ধের প্রকৃত ব্যয়, কৌশল এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সম্পর্কে কংগ্রেসকে পর্যাপ্ত তথ্য দিচ্ছে না। ফলে করদাতাদের অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়ে জনমনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই কংগ্রেসের ভেতরে এ নিয়ে বিতর্ক চলছে। আইনপ্রণেতাদের অভিযোগ, যুদ্ধ শুরুর আগে কিংবা পরে সংঘাতের লক্ষ্য, সম্ভাব্য সময়কাল এবং সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ব্রিফিং দেওয়া হয়নি। এ কারণে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
সিনেটের বরাদ্দবিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য প্যাটি মারে শুনানিতে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্যে এখনো অস্পষ্টতা রয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে রূপ নিলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা উভয়ই নতুন চাপে পড়তে পারে। একই শুনানিতে ডেমোক্র্যাট সিনেটর কার্স্টেন গিলিব্র্যান্ডও প্রশাসনের অবস্থানের সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের দেওয়া বক্তব্যে ধারাবাহিকতার অভাব রয়েছে, যা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।
অন্যদিকে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেনাসদস্যদের বেতন-ভাতা পরিশোধে কোনো সমস্যা হবে না। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, আধুনিক যুদ্ধ শুধু অস্ত্র ব্যবহার নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, লজিস্টিকস ও গোয়েন্দা সক্ষমতার ধারাবাহিক উন্নয়ন, যা পর্যাপ্ত অর্থ ছাড়া সম্ভব নয়।
শুনানিতে পিট হেগসেথ ২০২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদনের আহ্বান জানান। তাঁর মতে, বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে একাধিক অঞ্চলে সামরিক প্রস্তুতি বজায় রাখতে হচ্ছে। ফলে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না পেলে তা শুধু চলমান যুদ্ধ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
এদিকে চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর উভয় পক্ষের মধ্যে প্রতিদিনই হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটছে। পেন্টাগনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতে এ পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ৪৩০ জন আহত হয়েছেন। আহত সেনাদের অধিকাংশ চিকিৎসা শেষে আবার দায়িত্বে ফিরেছেন বলে জানানো হলেও সংঘাতের মানবিক মূল্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ব্যয় তত দ্রুত বাড়বে। একই সঙ্গে অস্ত্র, গোলাবারুদ, ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের মজুত পুনর্গঠনে আরও বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে ভবিষ্যতে করনীতি, বাজেট পুনর্বিন্যাস অথবা অতিরিক্ত ঋণের মতো কঠিন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তও বিবেচনায় নিতে হতে পারে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানে হামলার লক্ষ্যবস্তু আরও সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বিদ্যুৎকেন্দ্র, গুরুত্বপূর্ণ সেতু, খার্গ দ্বীপের তেল স্থাপনা এবং ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাসহ নতুন কয়েকটি কৌশলগত স্থাপনাকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মহলেও নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা বাজেট থাকলেও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ যে কোনো অর্থনীতির জন্য বড় চাপ তৈরি করতে পারে। বর্তমানে পেন্টাগনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু যুদ্ধ পরিচালনা নয়; বরং একই সঙ্গে সামরিক প্রস্তুতি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক সমর্থনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। কংগ্রেস অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ অনুমোদন করলেও যুদ্ধ কত দিন চলবে এবং এর চূড়ান্ত আর্থিক মূল্য কত হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত। ফলে ইরান সংঘাত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, ওয়াশিংটনের অর্থনীতি ও রাজনীতিতেও বড় পরীক্ষার মুখে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্রকে।