প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ঘোষিত আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। দলের নেতারা দাবি করছেন, তাদের কর্মসূচি এখন স্বাধীনতার পর দেশের অন্যতম বৃহৎ গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছে। সরকারের কাছে উত্থাপিত দাবিগুলো দ্রুত মেনে না নেওয়া হলে আগামী দিনগুলোতে আরও লাখ লাখ মানুষ দিল্লির রাজপথে নামবেন বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে দলটি। অন্যদিকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজধানীজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। একের পর এক মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, মোতায়েন করা হচ্ছে অতিরিক্ত আধাসামরিক বাহিনী।
বুধবার সকালে দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে দেওয়া এক আপডেটে সিজেপি জানায়, বিক্ষোভস্থলে হাজার হাজার আন্দোলনকারী অবস্থান করছেন এবং প্রতিনিয়ত আরও মানুষ সেখানে যোগ দিচ্ছেন। দলটির জাতীয় মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, বর্তমান কর্মসূচি কেবল সূচনা মাত্র। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি, বিশেষ করে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি গ্রহণ না করা হলে আন্দোলনের পরিধি আরও বিস্তৃত হবে এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ দিল্লিতে এসে আন্দোলনে অংশ নেবেন।
রাঙ্কার দাবি, এটি স্বাধীনতার পর ভারতের সবচেয়ে বড় গণআন্দোলনে রূপ নিতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আন্দোলনকারীরা শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি তুলে ধরছেন, কিন্তু আন্দোলনকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সহিংস বা অস্থিতিশীল হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, আন্দোলনকারীরা সংঘাত নয়, গণতান্ত্রিক উপায়ে নিজেদের দাবি আদায় করতে চান। তবে দাবি উপেক্ষা করা হলে আন্দোলন আরও তীব্র হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
এই আন্দোলনের পেছনে রয়েছে জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষা ব্যবস্থা, নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং নিট পরীক্ষা পরিচালনা নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং জবাবদিহিতার অভাবের কারণে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ কারণেই তাঁরা দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন।
এদিকে আন্দোলনের বিস্তার ঠেকাতে দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে প্রশাসন। দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন জানিয়েছে, প্রথমে জনপথ, রাজীব চৌক, প্যাটেল চৌক ও সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েটসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশন বন্ধ করা হলেও পরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় মোট ১৬টি স্টেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে রাজধানীর যাতায়াত ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি বেড়েছে।
সংসদের চলমান অধিবেশন, বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং সিজেপির আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অতিরিক্ত ২০ কোম্পানি সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (সিআরপিএফ) মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছে। সরকারি সূত্র জানায়, পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিমানযোগে এসব সদস্যকে দ্রুত দিল্লিতে আনা হচ্ছে, যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, রাজধানীতে একসঙ্গে একাধিক কর্মসূচি চলায় পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই সম্ভাব্য সংঘাত বা সহিংসতা এড়াতে আগাম প্রস্তুতি হিসেবে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে। যদিও আন্দোলনকারীদের দাবি, তারা সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছেন এবং সংঘাতের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
এই আন্দোলনের মানবিক দিকও আলোচনায় এসেছে। দিল্লির যন্তর মন্তরে অবস্থান নেওয়া আন্দোলনকারীদের জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধারণ মানুষ অনলাইনে খাবার পাঠাচ্ছেন। জনপ্রিয় খাবার সরবরাহকারী বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে পিৎজা, বার্গার, মোমো, থালি ও অন্যান্য খাবারের অর্ডার করা হচ্ছে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে।
বিক্ষোভস্থলের বাইরে টলস্টয় মার্গ ও সংসদ মার্গ এলাকায় সারাদিনই দেখা গেছে একের পর এক ডেলিভারি কর্মী খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন। ১৮ বছর বয়সী ডেলিভারি কর্মী আয়ু জ্যাকব জানান, মঙ্গলবার সকাল থেকেই তিনি বহুবার একই স্থানে খাবার সরবরাহ করেছেন। তাঁর ভাষায়, প্রতিবারই খাবার কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য নয়, বরং সেখানে অবস্থান নেওয়া আন্দোলনকারীদের মধ্যে বিতরণের জন্য পাঠানো হচ্ছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আন্দোলনের প্রতি ব্যাপক সমর্থন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিভিন্ন রাজ্যের মানুষ অনলাইনে অর্থ সহায়তা, খাবার এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠানোর পাশাপাশি আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের এই অংশগ্রহণ আন্দোলনের বিস্তার ও জনসম্পৃক্ততাকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে।
আন্দোলন শুধু ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সমাজকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুকের প্রতি সংহতি জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ও সান হোসেতেও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। মার্কিনভিত্তিক সংগঠন ‘হিন্দুস ফর হিউম্যান রাইটস’-এর উদ্যোগে আয়োজিত এসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা ওয়াংচুকের প্রতি সমর্থন জানিয়ে প্ল্যাকার্ড বহন করেন এবং বিভিন্ন স্লোগান দেন। নিউইয়র্কের ইউনিয়ন স্কোয়ার এবং সান হোসেতে মহাত্মা গান্ধীর মূর্তির সামনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তারা ভারতে শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের ভেতরের আন্দোলন আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচিত হওয়া সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে। বিশেষ করে বিদেশে বসবাসরত ভারতীয়দের একটি অংশ যখন প্রকাশ্যে সংহতি জানাচ্ছেন, তখন বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও গুরুত্ব পাচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, দিল্লির এই আন্দোলন আগামী কয়েক দিনে আরও বিস্তৃত হতে পারে। যদি সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় না বসে অথবা দাবিগুলোর বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান না জানায়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে রাজধানীতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
অন্যদিকে সরকার এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার ওপর জোর দেওয়া হলেও আন্দোলনের দাবিগুলো নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
দিল্লির রাজপথে চলমান এই আন্দোলন এখন শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; এটি শিক্ষা, গণতান্ত্রিক অধিকার, জনসমর্থন এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিয়ে জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আন্দোলন কতটা বিস্তৃত হবে, সরকার কী পদক্ষেপ নেবে এবং আলোচনার পথ খুলবে কি না—সেই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।