প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব ক্রিকেটে রূপকথার মতো উত্থান ঘটে চলা আফগানিস্তান ক্রিকেট দলের দীর্ঘমেয়াদী সফল অধ্যায় ও গৌরবময় এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে ওয়ানডে দলের অধিনায়কের পদ থেকে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে দাঁড়িয়েছেন দলের নির্ভরযোগ্য ও শান্ত স্বভাবের অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান হাশমতউল্লাহ শহীদি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে অত্যন্ত আবেগঘন ও বিনম্র এক বিবৃতির মাধ্যমে তিনি তাঁর এই পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা সারা বিশ্বের কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমী ও অনুসারীদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানান। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাস থেকে শুরু করে দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের ক্রিকেটকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পর চলতি বছরের জুনে ভারতের কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং সফর পর্যন্ত সর্বমোট ৫৫টি ওয়ানডে ম্যাচে আফগান ক্রিকেট দলকে অত্যন্ত সফলভাবে নেতৃত্ব দিয়ে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এই ৩১ বছর বয়সী প্রতিভাবান ও মার্জিত ব্যাটার। তাঁর এই আকস্মিক পদত্যাগের সংবাদটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মহলে এবং দক্ষিণ এশিয়ার ক্রীড়া অঙ্গনে তীব্র আলোচনার ঝড় উঠেছে, কারণ আফগান দলের এই ঐতিহাসিক রূপান্তরের নেপথ্যে তাঁর অবদান ছিল অত্যন্ত অবিস্মরণীয় ও সুদূরপ্রসারী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত নিজের বিদায়ী বার্তায় হাশমতউল্লাহ শহীদি অত্যন্ত পরিষ্কার ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, সম্পূর্ণ পারস্পরিক সম্মান, বোঝাপড়া এবং দলের ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখেই তিনি এই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন এবং আজ থেকে দেশের ওডিআই দলের অধিনায়কের পবিত্র দায়িত্ব থেকে নিজেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অব্যাহতি দিচ্ছেন। তিনি অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছেন যে, একজন অধিনায়ক হিসেবে তাঁর প্রিয় মাতৃভূমি ও দলের এই সমস্ত লড়াকু সতীর্থদের নেতৃত্ব দেওয়া এবং বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজ বা নীল রঙের সংমিশ্রণে দেশের জাতীয় পতাকা বুকে ধারণ করে প্রতিনিধিত্ব করা ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও পরম সম্মানের বিষয়। সততা, পারস্পরিক একতা এবং নিবেদিতপ্রাণ একাগ্রতা বজায় রেখে যেভাবে প্রতিটি সতীর্থ খেলোয়াড় মাঠে নিজেদের নিংড়ে দিয়েছেন, তার প্রতিটি মুহূর্তের জন্য তিনি সতীর্থদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকবেন বলে জানান। দল পরিচালনার দীর্ঘ এই যাত্রাপথে বহু কঠিন মুহূর্ত ও রোমাঞ্চকর জয় তাঁকে মানসিকভাবে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি আফগান ক্রিকেটকে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন পরিচয়ে পরিচিত করতে সাহায্য করেছে বলে তিনি দৃঢ় বিশ্বাস প্রকাশ করেন।
হাশমতউল্লাহ শহীদির বর্ণাঢ্য ও সুদীর্ঘ অধিনায়কত্বের মেয়াদে আফগানিস্তান ক্রিকেট দল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এমন কিছু অবিশ্বাস্য ও ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেছে, যা অতীতে কারোর কল্পনার বাইরে ছিল। তাঁর সুদৃঢ় ও দূরদর্শী নেতৃত্বে আফগানিস্তান দল ২০২৩ সালের স্মরণীয় এশিয়া কাপ এবং ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠিত ওয়ানডে বিশ্বকাপে অত্যন্ত গৌরবজনকভাবে অংশগ্রহণ করে বিশ্বজুড়ে হৈচৈ ফেলে দিয়েছিল। বিশেষ করে, ২০২৩ সালের আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপে হাশমতউল্লাহ শহীদির ক্ষুরধার কৌশল ও অনুপ্রেরণাদায়ী নেতৃত্বে আফগান দল বর্তমান ক্রিকেট বিশ্বের পরাশক্তি ইংল্যান্ড, শক্তিশালী পাকিস্তান, ঐতিহ্যবাহী শ্রীলঙ্কা এবং নিবেদিতপ্রাণ নেদারল্যান্ডসের মতো শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে একের পর এক অবিস্মরণীয় ও রোমাঞ্চকর জয় ছিনিয়ে এনে বিশ্ব ক্রিকেটকে রীতিমতো স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। বিশ্বমঞ্চে এই ধরনের চাঞ্চল্যকর ও স্মরণীয় পারফরম্যান্সের সুবাদে টুর্নামেন্টের পয়েন্ট টেবিলের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ষষ্ঠ স্থানে থেকে নিজেদের বিশ্বকাপ মিশন সফলভাবে শেষ করতে সক্ষম হয়েছিল আফগানিস্তান, যা তাদের ক্রিকেট ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক হয়ে রয়েছে।
বিশ্বকাপের সেই দুর্দান্ত সাফল্যের ফলেই আফগানিস্তান দল সরাসরি ২০২৫ সালে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী ও মর্যাদাপূর্ণ আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলার দুর্লভ ও ঐতিহাসিক সুযোগ অর্জন করেছিল, যেখানেও তারা নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিয়ে শক্তিশালী ইংল্যান্ড দলকে পুনরায় পরাজিত করতে সক্ষম হয়। যদিও গ্রুপ পর্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ম্যাচ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বৃষ্টির কারণে সম্পূর্ণ ভেসে যাওয়ায় কপাল গুণের কারণে সেমিফাইনালে খেলার গৌরব অর্জন করা থেকে সামান্যের জন্য বঞ্চিত হয়েছিল তারা, তবুও বিশ্ব ক্রিকেটের সুপার পাওয়ারদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আফগানদের এই অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা গোটা ক্রিকেট বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছিল। শুধু বিশ্বমঞ্চ বা বড় টুর্নামেন্টই নয়, শহীদির সাড়ে চার বছরের শাসনামলে আফগানিস্তান দল ঐতিহ্যবাহী দ্বিপক্ষীয় সিরিজগুলোতেও একের পর এক অবিশ্বাস্য ও ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করে নিজেদের শক্তির প্রমাণ দিয়েছে। তাঁর নিপুণ ও ঠান্ডা মাথার অধিনত্বেই আফগানরা শক্তিশালী বাংলাদেশকে তিনবার, জিম্বাবুয়েকে দুবার এবং ক্রিকেট পরাশক্তি দক্ষিণ আফ্রিকা ও উদীয়মান আয়ারল্যান্ডকে একবার করে দ্বিপক্ষীয় ওডিআই সিরিজে পরাজিত করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব বিশ্ববাসীর সামনে সগর্বে প্রমাণ করেছে।
অধিনায়কের বিরাট ও গুরুদায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হাশমতউল্লাহ শহীদির ব্যক্তিগত ও আন্তর্জাতিক ব্যাটিং পরিসংখ্যানে তেমন কোনো বড় নেতিবাচক বা পতনমূলক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি, বরং পরিসংখ্যানের পাতায় তিনি এক অবিচল আস্থার প্রতীক হয়ে ছিলেন। অধিনায়কত্বের গুরুদায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার আগে আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেটে তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাটিং গড় যেখানে ছিল ৩২.৯৭ এবং স্ট্রাইক রেট ছিল ৬৪.৩৯, সেখানে দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় ধরে দলের বোঝা মাথায় নিয়ে খেলার পর সেই পরিসংখ্যান সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে যথাক্রমে ৩৩.৭৯ এবং ৭০.৭৭ এ উন্নীত হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে দলের চরম সংকটময় মুহূর্তেও তিনি নিজের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের মান ঠিক কতটা নিখুঁতভাবে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর ৯৬ ম্যাচের বর্ণিল ওয়ানডে ক্যারিয়ারে তাঁর একমাত্র ঐতিহাসিক সেঞ্চুরিটি এসেছে আফগানিস্তানের একেবারে সর্বশেষ ওয়ানডে ম্যাচটিতে, যেখানে তিনি চেন্নাইয়ের অপরিচিত ও কঠিন পিচে ভারতের বিপক্ষে দুর্দান্ত লড়াই করে ১৩১ বল মোকাবিলা করে ১০২ রানের একটি নান্দনিক ও ম্যারাথন ইনিংস খেলে বিশ্ব ক্রিকেটের নজর কেড়ে নিয়েছিলেন।
আগামী আগস্ট মাসে সম্পূর্ণ নতুন উদ্যমে ওয়ানডে ফরম্যাটে নিজেদের দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলার জন্য আয়ারল্যান্ড সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে আফগানিস্তান ক্রিকেট দলের, যেখানে স্বাগতিকদের বিপক্ষে টানা পাঁচটি জমজমাট ওডিআই ম্যাচের দীর্ঘ ও কঠিন সিরিজে মুখোমুখি হবে তারা। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, আসন্ন এই গুরুত্বপূর্ণ আয়ারল্যান্ড সিরিজের জন্য এখনো পর্যন্ত আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে নতুন কোনো ওডিআই অধিনায়কের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি, যা নিয়ে ক্রিকেট পাড়ায় জল্পনা-কল্পনার অন্ত নেই। তবে দেশের আপামর ক্রিকেটপ্রেমী ও কোটি কোটি সমর্থকের জন্য সবচেয়ে স্বস্তির খবর হলো, হাশমতউল্লাহ শহীদি দলীয় নেতৃত্ব বা ক্যাপ্টেন্সির সুদীর্ঘ বোঝা স্বেচ্ছায় ঘাড় থেকে নামিয়ে দিলেও একজন অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত সিনিয়র ব্যাটসম্যান হিসেবে ওয়ানডে দলে তাঁর নিয়মিত খেলা এবং দেশের জার্সিতে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার তীব্র আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। অধিনায়কত্বের অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও প্রেসার ছাড়াই তিনি আগামী দিনগুলোতে একজন খাঁটি টিম ম্যান ও দলের প্রধান নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে আরও দীর্ঘদিন আফগান ক্রিকেটকে নিজের সেরা সেবা ও রান উপহার দিতে পারবেন বলে দেশের ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ ও শুভানুধ্যায়ীরা মনে করছেন।