একনেকে ১৪ হাজার কোটি টাকার ৮ প্রকল্প অনুমোদন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬
  • ১৫ বার
একনেকে ১৪ হাজার কোটি টাকার ৮ প্রকল্প অনুমোদন

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ, গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর লক্ষ্য নিয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রায় ১৪ হাজার ৪১ কোটি টাকার আটটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় অনুমোদিত এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বুধবার বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন জনাব তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পগুলো অনুমোদন দেওয়া হয়। সভা শেষে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানানো হয়, অনুমোদিত আটটি প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ৪১ কোটি ২১ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন থেকে ব্যয় হবে ১০ হাজার ৪৯৪ কোটি ২১ লাখ টাকা এবং প্রকল্প ঋণ হিসেবে আসবে ৩ হাজার ৫৫০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।

সভায় জানানো হয়, অনুমোদিত আটটি প্রকল্পের মধ্যে তিনটি নতুন প্রকল্প এবং পাঁচটি সংশোধিত প্রকল্প। সরকারের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, চলমান প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি এবং ব্যয়ের যৌক্তিকতা বিবেচনায় এসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

একনেক সভায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, শিল্প, বস্ত্র ও পাট এবং বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকিসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের তিনটি প্রকল্প বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘সার্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন-২ (জিএসআইডিপি-২)’ প্রকল্পের প্রথম সংশোধন, বৃহত্তর দিনাজপুর অঞ্চলের সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প এবং পল্লী সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মসংস্থান প্রকল্প। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত হবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে।

আঞ্চলিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলাকে কেন্দ্র করে নেওয়া সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত উন্নয়নে পিছিয়ে থাকা এই অঞ্চলে সড়ক, জনসেবা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনও অনুমোদন পেয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হওয়া বাংলাদেশে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ ও বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর আধুনিকায়নকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দুর্যোগের সময় মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় সক্ষমতা আরও বাড়বে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনও অনুমোদন পেয়েছে। রাজধানীর যানজট নিরসন, শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করা এবং পণ্য পরিবহনের সময় কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে এই প্রকল্পকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্পও একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো সিলেট বিভাগের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধন। ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মোকাবিলা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে এ প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্য প্রকল্পটির আওতায় বেগমগঞ্জ-৫ মূল্যায়ন ও উন্নয়ন কূপ এবং বেগমগঞ্জ-৬ ও সুনেত্র-২ অনুসন্ধান কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দেশীয় গ্যাসের নতুন উৎস অনুসন্ধান এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে এ উদ্যোগকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য অস্থির থাকায় নিজস্ব সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোর বিদ্যমান কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ এবং জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে ১০ শয্যার নতুন ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপনের সংশোধিত প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে। দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ের রোগীদের রাজধানীমুখী চিকিৎসা নির্ভরতা কমাতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সভায় আরও জানানো হয়, পরিকল্পনামন্ত্রী ইতোমধ্যে অনুমোদন দেওয়া ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়সংবলিত ১১টি প্রকল্প সম্পর্কেও একনেককে অবহিত করেছেন। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক অফিস স্থাপন, বরিশাল টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট নির্মাণ, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে মোবাইল নেটওয়ার্ক স্থাপন, বিভিন্ন আঞ্চলিক ও জেলা মহাসড়ক উন্নয়ন, ভুয়াপুর লিংক সড়ক নির্মাণ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো উন্নয়ন, পূর্বাঞ্চলীয় গ্রিড সম্প্রসারণ এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় বিটাকের নতুন কেন্দ্র স্থাপনসহ একাধিক উন্নয়ন উদ্যোগ।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সময়সীমা, ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং গুণগত মান নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। অতীতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি ও সময়ক্ষেপণের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় এবার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় আরও কঠোর নজরদারি রাখা হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বড় আকারের উন্নয়ন প্রকল্প দেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যথাযথ পরিকল্পনা ও কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা গেলে এসব প্রকল্প দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে আরও গতিশীল করবে এবং জনগণ সরাসরি এর সুফল ভোগ করতে পারবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত