প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে এক সুদূরপ্রসারী ও যুগান্তকারী মোড় এনে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরবকে একটি আধুনিক ও শান্তিপূর্ণ বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সর্বাত্মক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বিপক্ষীয় পারমাণবিক চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করেছেন, যা বিশ্ব কূটনীতি ও অর্থনীতির বাজারে এক নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশ্বখ্যাত মার্কিন দৈনিক দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল দেশটির নির্ভরযোগ্য সরকারি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে গত মঙ্গলবার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এই চাঞ্চল্যকর সংবাদটি প্রথম প্রকাশ করে, যা পরবর্তীতে তুরস্কের শীর্ষস্থানীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি সহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার লাভ করে। দীর্ঘ দিন ধরে চলা জটিল আলোচনা ও কূটনৈতিক দেনদরবারের অবসান ঘটিয়ে সম্পাদিত এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের সমীকরণকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক ও গবেষকগণ।
প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং মার্কিন প্রশাসনিক সূত্রের পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই অতি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিটির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে দীর্ঘ ত্রিশ বছর এবং এর সম্ভাব্য আর্থিক মূল্য কয়েক বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে জোরালো প্রাক্কলন করা হয়েছে। তবে এই সুদীর্ঘ চুক্তির মূল ও কৌশলগত উদ্দেশ্য কেবল পারমাণবিক প্রযুক্তি হস্তান্তর বা বাণিজ্যিক মুনাফা অর্জন নয়, বরং এর মাধ্যমে সৌদি আরবের বিশাল পারমাণবিক অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের আধুনিক সুবিধা উন্নয়নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে অত্যন্ত কেন্দ্রীয় ও প্রধান ভূমিকা প্রদান করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও লাভজনক খাত থেকে অন্য যেকোনো বিদেশি বা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীকে কঠোরভাবে বাইরে বা প্রতিযোগিতার বাইরে রেখে মার্কিন একচ্ছত্র প্রভাব ও প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার একটি সুকৌশলী কূটনৈতিক চাল রয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে আমেরিকার অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব বহুলাংশ সুদৃঢ় হবে বলে হোয়াইট হাউসের নীতিনির্ধারকরা বিশ্বাস করেন।
প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যৌথ এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার মাধ্যমে যদি পারমাণবিক জ্বালানি বা বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রযুক্তিগত প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত হয়, তবে সৌদি আরবের ভূখণ্ডে একটি সম্পূর্ণ আধুনিক ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা ইউরেনিয়াম এনরিচমেন্ট কেন্দ্র নির্মাণ করবে খোদ মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও প্রযুক্তিগতভাবে জটিল একটি বিষয় মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে স্থাপন করার বিষয়টি অতীতে সবসময় পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে সন্দেহের চোখে দেখা হলেও, বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে এটি বাস্তবায়নের পথ সুগম করে এক নতুন ঝুঁকি ও সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে। তাছাড়া, এই দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মাধ্যমে সৌদি আরবের উদীয়মান পারমাণবিক কর্মসূচি এবং তার সামগ্রিক কার্যক্রমের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি ও পর্যবেক্ষণে মার্কিন সরকারের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করা হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের জোরালো দাবি অনুযায়ী, পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর মার্কিন নজরদারির এই সুনির্দিষ্ট বিধান থাকার কারণে এই প্রযুক্তি বা পরিকাঠামো কোনোভাবেই যেন সামরিক উদ্দেশ্যে বা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মতো ধ্বংসাত্মক কাজে অপব্যবহার করা না হয়, তা নিশ্চিত করতে এটি অত্যন্ত কার্যকরভাবে সহায়তা করবে। মধ্যপ্রাচ্যের মতো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও প্রায়শই যুদ্ধবিগ্রহে উত্তপ্ত থাকা অঞ্চলে অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং পারমাণবিক নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই নজরদারি ব্যবস্থাকে একটি অন্যতম বড় রক্ষাকচ্ছপ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে হোয়াইট হাউসের কূটনীতিবিদরা। তবে আঞ্চলিক নিরাপত্তার এই আশ্বাসের পরেও আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রযুক্তি সৌদি আরবের মতো একটি রক্ষণশীল রাজতন্ত্রের হাতে ছেড়ে দেওয়ার দীর্ঘমেয়াদী ভূরাজনৈতিক পরিণতি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী হতে পারে, যা ইসরায়েলসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর উদ্বেগকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
আসন্ন আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই অত্যন্ত গোপনীয়তা ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই চুক্তিটি আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে প্রেরিত হওয়ার কথা রয়েছে, তবে সেখানে এটি তীব্র রাজনৈতিক আপত্তি ও বাধার মুখে পড়তে পারে বলে জোরালো ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অত্যন্ত অস্থিতিশীল ও পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের মতো একটি দেশের হাতে পারমাণবিক সক্ষমতা সম্প্রসারণ করার বিষয়টি নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের অনেক আইনপ্রণেতার মনে তীব্র সংশয় ও গভীর উদ্বেগ রয়েছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির পাশাপাশি অনেক রক্ষণশীল রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাও মনে করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার ঝুঁকি এড়াতে এ ধরনের চুক্তির ক্ষেত্রে আরও বহু বেশি স্বচ্ছতা এবং কঠোর শর্ত আরোপ করা উচিত ছিল। ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসে এই রাজনৈতিক দেওয়াল কীভাবে ভাঙবে এবং শেষ পর্যন্ত কড়া বিরোধিতাকে পাশ কাটিয়ে এই বিলিয়ন ডলারের পারমাণবিক চুক্তিটি চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।