ভিসা ছাড়াই ৩৫ দেশে ভ্রমণের সুযোগ বাংলাদেশিদের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬
  • ১৮ বার
ভিসা ছাড়াই ৩৫ দেশে ভ্রমণের সুযোগ বাংলাদেশিদের

প্রকাশ:  ২২ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ও বহুল প্রতীক্ষিত বৈশ্বিক পাসপোর্টের শক্তি সূচকে দারুণ অগ্রগতি অর্জন করে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে তিন ধাপ এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্বনামধন্য বৈশ্বিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের পক্ষ থেকে সদ্য প্রকাশিত ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী এই বৈশ্বিক পাসপোর্ট সূচকে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান উন্নীত হয়ে ৯৭তম স্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাসপোর্টের কার্যকারিতা, বিশ্বজুড়ে ভ্রমণের স্বাধীনতা এবং কূটনৈতিক সুসম্পর্কের মাপকাঠিতে প্রস্তুত করা এই নতুন র‌্যাংকিং অনুযায়ী, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মোট ৩৫টি দেশে কোনো ধরনের আগাম ভিসা ঝামেলা ছাড়াই কিংবা সরাসরি ভিসামুক্ত ও অন-অ্যারাইভাল সুবিধায় অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণ করতে পারবেন। গত মঙ্গলবার ব্রিটিশ এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে এই সূচকটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই দেশের ভ্রমণপিপাসী ও সচেতন নাগরিক মহলে ব্যাপক কৌতূহল ও ইতিবাচক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের প্রকাশিত এই আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন ও তথ্যানুযায়ী, মূলত একটি দেশের নাগরিকরা আগাম ভিসা ছাড়াই বা অন-অ্যারাইভাল ভিসার সুবিধায় বিশ্বের মোট কতটি দেশে অবাধে ভ্রমণ করতে পারেন, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান ও মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করেই এই বৈশ্বিক পাসপোর্ট সূচকটি তৈরি করা হয়ে থাকে। এবারের এই বিশাল ও সর্বাঙ্গীন মূল্যায়নে বিশ্বের মোট ১৯৯টি দেশের পাসপোর্ট এবং তাদের নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত ২২৭টি সম্ভাব্য ভ্রমণ গন্তব্যের তথ্য অত্যন্ত নিবিড়ভাবে বিবেচনা করা হয়েছে। প্রকাশিত নতুন এই সূচকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, বাংলাদেশ এবং উত্তর কোরিয়া যৌথভাবে বর্তমানে একই ৯৭তম অবস্থানে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের বৈশ্বিক শক্তিশালী পাসপোর্টের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০০তম, আর সে সময় বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা এই ধরনের ভিসামুক্ত বা অন-অ্যারাইভাল সুবিধা নিয়ে মোট ৩৭টি দেশে ভ্রমণ করতে পারতেন। যদিও গন্তব্যের সংখ্যা সামান্য দুই দেশ কমলেও সামগ্রিক বৈশ্বিক পজিশনের দিক থেকে বাংলাদেশ ঠিকই তিন ধাপ এগিয়ে ৯৭তম স্থানে উন্নীত হয়েছে, যা দেশের পাসপোর্টের মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক ও আশাব্যাঞ্জক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গত এক দশক ধরে বৈশ্বিক পাসপোর্ট সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের ধারাবাহিক পরিবর্তন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বিভিন্ন সময়ে দেশের র‌্যাংকিংয়ে নানা ধরনের ওঠানামা লক্ষ করা গেছে। বিগত ২০২০ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৯৮তম, যা পরবর্তীতে ২০২১, ২০২২ ও ২০২৩ সালে যথাক্রমে অবনতি ঘটে ১০৮তম, ১০৩তম এবং ১০১০১তম স্থানে গিয়ে ঠেকেছিল। তবে এর পরের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়ে ৯৭তম অবস্থানে উন্নীত হয়েছিল, এবং ২০২৫ সালে সামান্য পিছিয়ে ১০০তম স্থানে নেমে গেলেও ২০২৬ সালের এই মধ্যবর্তী সূচকে পুনরায় তিন ধাপ এগিয়ে সেই পুরোনো ৯৭তম অবস্থানে ফিরে এসেছে। অন্যদিকে, সমসাময়িক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত উত্তর কোরিয়ার অবস্থান গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের সূচকে ৯৯তম স্থানে ছিল, যা বর্তমান মূল্যায়নে বাংলাদেশের সমকক্ষ হিসেবে ৯৭তম স্থানে উঠে এসেছে। বিশ্ব ভূরাজনীতি ও অর্থনৈতিক কূটনীতির নানামুখী চ্যালেঞ্জের মাঝেও বাংলাদেশের পাসপোর্টের এই স্থিতিশীলতা এবং সামান্য অগ্রগতি দেশের নাগরিকদের বৈশ্বিক চলাচলের পরিসরকে কিছুটা হলেও স্বস্তি জোগাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রতিবেদনের বিশদ বিবরণ অনুযায়ী, বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা বর্তমানে বিশ্বের যেসব দেশে সম্পূর্ণ ভিসামুক্ত, অন-অ্যারাইভাল কিংবা নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সহজলভ্য ই-ভিসার মাধ্যমে ভ্রমণ করার চমৎকার সুযোগ ভোগ করছেন, সেই দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং ওশেনিয়া মহাদেশের বেশ কিছু মনোরম ও আকর্ষণীয় রাষ্ট্র। এই দেশগুলোর মধ্যে আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী দেশ ভুটান এবং নেপাল অন্যতম, যেখানে বাংলাদেশি নাগরিকরা অনায়াসেই ভ্রমণ করতে পারেন। এছাড়া ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস, বুরুন্ডি, কম্বোডিয়া, কোমোরোস, কুক আইল্যান্ডস, জিবুতি, ডোমিনিকা, ফিজি, গ্রেনাডা, গিনি-বিসাউ, হাইতি, জামাইকা, কেনিয়া, কিরিবাতি, মাদাগাস্কার, দক্ষিণ এশিয়ার অপর রত্ন মালদ্বীপ, মাইক্রোনেশিয়া, মন্টসেরাট, নিউয়ে, সুন্দর দ্বীপরাষ্ট্র বারবাডোস, রুয়ান্ডা, সামোয়া, সেশেলস, সিয়েরা লিওন, অপরূপ সৌন্দর্যের দেশ শ্রীলঙ্কা, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, সেন্ট ভিনসেন্ট অ্যান্ড দ্য গ্রেনাডিন্স, দ্য বাহামাস, দ্য গাম্বিয়া, পূর্ব তিমুর বা তিমুর-লেস্তে, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, টুভালু এবং ভানুয়াতু নামক এই সমস্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা অত্যন্ত সহজ শর্তে বা বিনা ভিসায় প্রবেশের সৌভাগ্য অর্জন করে থাকেন।

অন্যদিকে, হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের এই বৈশ্বিক পাসপোর্টের সামগ্রিক তালিকায় বরাবরের মতো এবারও শীর্ষস্থান অক্ষুণ্ণ ও দৃঢ়ভাবে ধরে রেখেছে এশিয়ার অর্থনৈতিক বাঘ হিসেবে পরিচিত সিঙ্গাপুর। বিশ্বমঞ্চে সিঙ্গাপুরের পাসপোর্টধারীরা বর্তমানে এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়ে আগাম কোনো ধরনের ঝুটঝামেলা ছাড়াই বিশ্বের মোট ১৯২টি দেশে সম্পূর্ণ ভিসামুক্ত বা অন-অ্যারাইভাল সুবিধায় ভ্রমণ করার অবারিত সুযোগ ভোগ করছেন। তালিকার দ্বিতীয় অত্যন্ত সম্মানজনক অবস্থানে যৌথভাবে যৌথভাবে রাজত্ব করছে বিশ্বের তিন পরাশক্তি ও উন্নত দেশ—জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক পাওয়ারহাউস সংযুক্ত আরব আমিরাত বা ইউএই। এই তিনটি দেশের অদম্য নাগরিকরা বিশ্বের মোট ১৮৮টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়াই স্বাধীনভাবে ভ্রমণের দুর্লভ সুযোগ পেয়ে থাকেন। তালিকার তৃতীয় অবস্থানে অত্যন্ত গৌরবময় জায়গায় রয়েছে ইউরোপের অন্যতম সুন্দর দেশ সুইডেন, যার নাগরিকরা বিশ্বের মোট ১৮৭টি দেশে কোনো ধরনের ভিসা জটিলতা ছাড়াই অবাধে ভ্রমণ করতে সক্ষম হন।

এছাড়াও তালিকার চতুর্থ অবস্থানে যৌথভাবে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও উন্নত এগারোটি দেশ, যাদের মধ্যে রয়েছে বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে এবং স্পেন। এই এগারোটি দেশের সৌভাগ্যবান নাগরিকরা বিশ্বের মোট ১৮৬টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়াই ভ্রমণের সুবর্ণ সুযোগ ভোগ করে থাকেন। পঞ্চম অবস্থানে যৌথভাবে অবস্থান করছে অস্ট্রিয়া, গ্রিস, মাল্টা, পর্তুগাল এবং সুইজারল্যান্ড, যাদের ভিসামুক্ত গন্তব্যের সংখ্যা মোট ১৮৫টি। ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্য, যে তিন দেশের নাগরিকরা বিশ্বের মোট ১৮৪টি দেশে অনায়াসে যাতায়াত করতে পারেন। সপ্তম অবস্থানে যৌথভাবে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, চেক প্রজাতন্ত্র, লাটভিয়া, মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড, স্লোভাকিয়া এবং স্লোভেনিয়া, যাদের নাগরিকরা ১৮৩টি দেশে ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুবিধা পেয়ে থাকেন। অষ্টম অবস্থানে থাকা ক্রোয়েশিয়া ও এস্তোনিয়ার নাগরিকরা ১৮২টি দেশে, নবম অবস্থানে থাকা লিচেনস্টেইন ও লিথুনিয়ার নাগরিকরা ১৮১টি দেশে এবং দশম অবস্থানে থাকা আইসল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা বিশ্বের মোট ১৮০টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়াই ভ্রমণের দুর্দান্ত সুযোগ উপভোগ করছেন।

বাংলাদেশের এই তিন ধাপ অগ্রগতি এবং বৈশ্বিক সূচকে অবস্থান কিছুটা উন্নত হলেও, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার, উচ্চশিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে আমাদের পাসপোর্টের অবস্থানকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। বিশ্বের প্রভাবশালী ও উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক দরকষাকথি জোরদার করার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা এবং বৈশ্বিক মানদণ্ডে সুশাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল পাসপোর্টের মান কাক্সিক্ষত পর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব। আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে এবং আরও বেশি সংখ্যক দেশীয় নাগরিক যাতে সহজ শর্তে বিশ্বভ্রমণের সুযোগ পেতে পারেন, সেই প্রত্যাশাই এখন দেশের প্রতিটি সচেতন মানুষের মনে উঁকি দিচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত