এলডিসি উত্তরণে সিদ্ধান্ত যাবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬
  • ১৬ বার
এলডিসি উত্তরণে সিদ্ধান্ত যাবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ এক অগ্রগতি হয়েছে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) বাংলাদেশের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর আবেদন সরাসরি অনুমোদন না দিয়ে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের কাছে সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে নেপালের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সুপারিশ করা হয়েছে। ফলে আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথ উন্মুক্ত হলো।

বুধবার জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এর আগে মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ইকোসকের বৈঠকে সদস্য রাষ্ট্রগুলো সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে জাতিসংঘে নিযুক্ত স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাউদ্দিন নোমান চৌধুরী এলডিসি থেকে টেকসই, মসৃণ ও স্থিতিশীল উত্তরণ নিশ্চিত করতে প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

বাংলাদেশ সরকার চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন জানায়, যাতে এলডিসি থেকে উত্তরণের নির্ধারিত সময় ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। সরকারের যুক্তি ছিল, গত কয়েক বছরে একের পর এক দেশীয় ও বৈশ্বিক সংকটের কারণে নির্ধারিত পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকাল পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। ফলে অর্থনৈতিক সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য আরও সময় প্রয়োজন।

এলডিসি থেকে উত্তরণ একটি দেশের জন্য যেমন মর্যাদার বিষয়, তেমনি এটি অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি করে। এলডিসি মর্যাদা হারালে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য বিদ্যমান বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধা, সহজ শর্তে উন্নয়ন সহায়তা এবং বিশেষ আন্তর্জাতিক সুবিধার কিছু অংশ ধীরে ধীরে কমে আসে। তাই উত্তরণকে সফল ও টেকসই করতে প্রয়োজন হয় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানি কাঠামো গড়ে তোলার।

বৈঠকে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি বলেন, দেশের উন্নয়নযাত্রা যেন বাধাগ্রস্ত না হয় এবং উত্তরণের সুফল দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিত করা যায়, সে জন্য অতিরিক্ত প্রস্তুতিকাল অপরিহার্য। তিনি উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ বাংলাদেশের প্রস্তুতি বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে।

জাতিসংঘের নীতিতেও বলা হয়েছে, কোনো দেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের ফলে যেন তার অর্জিত উন্নয়ন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এই নীতিকে সামনে রেখেই বাংলাদেশ যুক্তি তুলে ধরেছে যে, প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধি উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে পড়ার ইঙ্গিত নয়; বরং সুশৃঙ্খল, পরিকল্পিত ও টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করার একটি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ।

বাংলাদেশের আবেদনের বিষয়ে এর আগে ইতিবাচক অবস্থান নেয় কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি। গত জুন মাসে সিডিপি বাংলাদেশের আবেদনকে সমর্থন করলেও কত বছরের জন্য সময় বাড়ানো উচিত, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সুপারিশ করেনি। তবে তারা বিষয়টি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিবেচনার জন্য পাঠানোর পক্ষে মত দেয়। সেই সুপারিশের ধারাবাহিকতায় এবার ইকোসকও সাধারণ পরিষদকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো হয়। গত ৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘের মহাসচিবকে একটি চিঠি পাঠিয়ে ব্যক্তিগত সহযোগিতা কামনা করেন। পরে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল নিউইয়র্কে ইকোসকের সভাপতি, নেপালের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত লোক বাহাদুর থাপা এবং ইকোসকের সহসভাপতি ও আলজেরিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের আবেদন এবং এর যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়।

শুধু জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের সঙ্গেই নয়, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর স্থায়ী মিশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও একাধিক দফা মতবিনিময় করেছে বাংলাদেশ। ঢাকায় কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক, কাঠমান্ডুতে ইকোসকের সভাপতির সঙ্গে আলোচনা এবং নিউইয়র্কে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে যায়। কূটনৈতিক মহলের ধারণা, এসব প্রচেষ্টার ইতিবাচক প্রতিফলনই ইকোসকের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়েছে।

সরকারের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, গত চার বছরে দেশের অর্থনীতি একাধিক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। কোভিড-১৯ পরবর্তী পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং দীর্ঘদিন ধরে চলমান রোহিঙ্গা সংকট সরকারের মনোযোগকে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পরিবর্তে তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার দিকে নিয়ে যায়। এর ফলে প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার, আর্থিক খাতের পুনর্গঠন এবং উত্তরণ-পরবর্তী প্রস্তুতির অনেক কাজ নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।

সরকার আরও জানিয়েছে, নতুন প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের সময় একটি নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধীরগতি এবং রাজস্ব আহরণে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও সময় প্রয়োজন। এই বাস্তবতায় তিন বছরের অতিরিক্ত প্রস্তুতিকাল দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সহায়ক হবে।

প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর সুযোগ পাওয়া গেলে সরকার ‘থ্রি আর’ শীর্ষক পাঁচ বছর মেয়াদি একটি কৌশল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছে। এই কৌশলের মাধ্যমে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, সুশাসন জোরদার করা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা, ব্যবসা সহজীকরণ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। সরকারের বিশ্বাস, এসব সংস্কার সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এলডিসি-পরবর্তী সময়েও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি থেকে উত্তরণের নির্ধারিত তারিখ আগামী ২৪ নভেম্বর। তার আগেই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা রয়েছে। সাধারণ পরিষদ যদি ইকোসকের সুপারিশ অনুমোদন করে, তাহলে বাংলাদেশ আরও তিন বছর প্রস্তুতির সুযোগ পাবে। এতে রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা থেকে ধাপে ধাপে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং অর্থনৈতিক সংস্কার সম্পন্ন করার জন্য সরকার অতিরিক্ত সময় হাতে পাবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এলডিসি থেকে উত্তরণ বাংলাদেশের দীর্ঘ অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার স্বীকৃতি হলেও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সতর্ক পরিকল্পনা প্রয়োজন। কারণ উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে এবং রপ্তানি খাতকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। তাই প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর বিষয়টি শুধু সময় বৃদ্ধির আবেদন নয়; বরং দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এখন সবার দৃষ্টি আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের দিকে, যেখানে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের ভবিষ্যৎ সময়সূচি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত