লিগ্যাল এইড সংস্কারে মামলা কমেছে ৬২ শতাংশ: আসিফ নজরুল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬
  • ১৮ বার
লিগ্যাল এইড সংস্কারে মামলা কমেছে ৬২ শতাংশ: আসিফ নজরুল

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নেওয়া লিগ্যাল এইড বা রাষ্ট্রীয় আইনগত সহায়তা ব্যবস্থার সংস্কারের ইতিবাচক প্রভাব এখন দৃশ্যমান বলে দাবি করেছেন সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিচারপূর্ব বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও বিস্তৃত করার ফলে আইনগত সহায়তার আওতাধীন নতুন মামলা দায়েরের সংখ্যা এক বছরের ব্যবধানে গড়ে ৬২ শতাংশ কমে এসেছে। তিনি মনে করেন, এই উদ্যোগের পূর্ণ বাস্তবায়ন হলে দেশের দীর্ঘদিনের মামলা-জট কমানোর ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে ড. আসিফ নজরুল এসব তথ্য তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য ঘিরে আইন অঙ্গন, বিচারব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট মহল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারব্যবস্থায় মামলা-জট কমানো এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে কার্যকর করার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। এ অবস্থায় লিগ্যাল এইড ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে আসিফ নজরুলের বক্তব্য বিষয়টিকে নতুন করে গুরুত্বের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

ফেসবুক পোস্টে ড. আসিফ নজরুল লিখেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একাধিক সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল লিগ্যাল এইড আইনের সংস্কার। তিনি জানান, সংস্কারের অংশ হিসেবে বিচারপূর্ব বিরোধ নিষ্পত্তির আওতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়। একই সঙ্গে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আদালতে মামলা দায়েরের আগে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা হয়। এই প্রক্রিয়াকে কার্যকর করতে আগের তুলনায় তিন গুণ বেশি বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ড. আসিফ নজরুলের দাবি, এই সংস্কারের বাস্তব সুফল ইতোমধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু এই সংস্কারের ফলেই আইনগত সহায়তার আওতাধীন মামলা দায়েরের সংখ্যা এক বছরে গড়ে ৬২ শতাংশ কমে এসেছে। তিনি এ অর্জনকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি ছিল একটি পাইলট প্রকল্প এবং ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত পরিসরে বাস্তবায়নের বিধানও রাখা হয়েছিল।

তিনি তাঁর পোস্টে বর্তমান আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানের প্রতিও আস্থা প্রকাশ করেন। ড. আসিফ নজরুল বলেন, বর্তমান আইনমন্ত্রী একজন দক্ষ আইনবিদ এবং তিনি নিশ্চয়ই এই সংস্কার কার্যক্রমের পূর্ণ বাস্তবায়ন করবেন। তাঁর বিশ্বাস, এ উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে দেশের বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে থাকা মামলা-জট উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে এবং সাধারণ মানুষের জন্য দ্রুত ও সহজ বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো দীর্ঘসূত্রতা এবং বিপুলসংখ্যক বিচারাধীন মামলা। বিভিন্ন সময় সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন আদালতে লাখ লাখ মামলা বছরের পর বছর ধরে বিচারাধীন রয়েছে। এতে বিচারপ্রার্থী মানুষের সময়, অর্থ এবং শ্রমের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সম্পদেরও ব্যাপক অপচয় ঘটে। একই সঙ্গে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার বিলম্বিত হয়, যা বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার ওপরও প্রভাব ফেলে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের বাইরে সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা বিশ্বের অনেক দেশেই কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ধরনের ব্যবস্থার মাধ্যমে পারিবারিক, দেওয়ানি, আর্থিক এবং কিছু নির্দিষ্ট ধরনের বিরোধ দ্রুত ও কম খরচে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়। ফলে আদালতের ওপর মামলার চাপও কমে আসে এবং বিচারকরা জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোতে আরও বেশি সময় দিতে পারেন।

রাষ্ট্রীয় আইনগত সহায়তা কার্যক্রম মূলত অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বিনামূল্যে বা স্বল্প ব্যয়ে আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়। এই ব্যবস্থার আওতায় মামলা পরিচালনার পাশাপাশি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, লিগ্যাল এইড ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করা গেলে বিচারপ্রার্থীদের একটি বড় অংশ আদালতের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় না গিয়ে দ্রুত সমাধান পেতে পারেন।

আসিফ নজরুলের বক্তব্যে উল্লেখ করা ৬২ শতাংশ মামলা হ্রাসের তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। তবে এই পরিসংখ্যানের বিস্তারিত সরকারি প্রতিবেদন, সময়কাল, মূল্যায়ন পদ্ধতি বা সংশ্লিষ্ট তথ্য তাঁর পোস্টে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

আইন মন্ত্রণালয় অতীতেও বিভিন্ন সময়ে বিচারব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং মামলা-জট কমানোর লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ গ্রহণের কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে আদালতের কার্যক্রম ডিজিটাল করা, অনলাইন সেবা সম্প্রসারণ, মধ্যস্থতা কার্যক্রম জোরদার এবং লিগ্যাল এইড ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা উল্লেখযোগ্য।

বিশ্লেষকদের মতে, কেবল আইন সংস্কার করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি প্রয়োজন দক্ষ জনবল, পর্যাপ্ত অবকাঠামো, বিচারকদের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি। একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থার সব অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া মামলা-জট নিরসনের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে।

এদিকে ড. আসিফ নজরুলের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে আবারও আলোচনায় এসেছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া বিভিন্ন আইনগত সংস্কার উদ্যোগ। সমর্থকদের মতে, এসব উদ্যোগ বিচারব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার ভিত্তি তৈরি করেছে। অন্যদিকে সমালোচকদের একটি অংশ মনে করেন, সংস্কারের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে তার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন, স্বাধীন মূল্যায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের ওপর।

বিচারপ্রার্থীদের জন্য দ্রুত, সহজলভ্য এবং ব্যয়-সাশ্রয়ী বিচার নিশ্চিত করা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে লিগ্যাল এইড ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ানো এবং আদালতের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ সম্প্রসারণকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ড. আসিফ নজরুলের দাবি অনুযায়ী, যদি মামলা দায়েরের হার সত্যিই উল্লেখযোগ্যভাবে কমে থাকে এবং এই প্রবণতা ভবিষ্যতেও বজায় থাকে, তবে তা দেশের বিচারব্যবস্থার জন্য একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট হবে সংশ্লিষ্ট সরকারি তথ্য, স্বাধীন মূল্যায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়নের ফলাফলের মাধ্যমে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত