সিলেটে ৫ দিনে হামের উপসর্গে প্রাণ গেল ১১ শিশুর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬
  • ১০ বার
সিলেটে ৫ দিনে হামের উপসর্গে প্রাণ গেল ১১ শিশুর

প্রকাশ:  ২২ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল প্রশাসনিক বিভাগ সিলেটে বর্তমানে এক ভয়ংকর ও হৃদয়বিদারক মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে, যা গোটা দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সচেতন মহলকে চরমভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। পবিত্র ও আধ্যাত্মিক এই জনপদে গত মাত্র পাঁচদিনের ব্যবধানে মারাত্মক ও প্রাণঘাতী হাম রোগের উপসর্গ নিয়ে অত্যন্ত মর্মান্তিক ও বেদনাদায়কভাবে ১১টি নিষ্পাপ শিশুর অকাল মৃত্যু ঘটেছে, যা পুরো অঞ্চলের আকাশ-বাতাস ভারী করে তুলেছে। সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় থেকে সদ্য প্রকাশিত এক অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই লোমহর্ষক তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত কেবল সিলেট বিভাগেই হামের অনুরূপ উপসর্গ ও জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারী শিশুর সংখ্যা হু হু করে বেড়ে সর্বমোট ১০৭ জনে গিয়ে ঠেকেছে। রাজধানী ঢাকা মহানগরীর পরেই গোটা দেশের পরিসংখ্যানে হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যুর দিক থেকে বর্তমানে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে এই সিলেট বিভাগ, যা স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার করুণ চিত্র ও বড় ধরনের মহামারির আশঙ্কার কথা স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলছে।

সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় থেকে গণমাধ্যমের কাছে সরবরাহ করা সর্বশেষ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, আজ বুধবার সকাল পর্যন্ত বিগত চব্বিশ ঘণ্টার অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও সংকটময় সময়ের ব্যবধানে হামের জটিল উপসর্গ নিয়ে আরও দুটি ফুটফুটে শিশু চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। মর্মান্তিক এই ঘটনায় প্রাণ হারানো শিশু দুটির মধ্যে একজন হলো মৌলভীবাজার জেলার সীমান্তবর্তী কুলাউড়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কাজীপুর গ্রামের বাসিন্দা বিবেকের আদরের মাত্র পাঁচ মাস বয়সি কন্যাসন্তান আরাধ্যা এবং অপরজন হলো হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার হরিকলা গ্রামের সুমন মিয়ার ফুটফুটে মেয়ে তাইবা। এই হতভাগ্য শিশু দুটি তাদের স্বজনদের বুক খালি করে সিলেটের সর্বকালের অন্যতম প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন ছিল। চিকিৎসকদের শত চেষ্টা ও নিবিড় পরিচর্যা সত্ত্বেও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যাওয়ায় এই ছোট্ট প্রাণগুলো বাঁচানো সম্ভব হয়নি, যা তাদের শোকার্ত পরিবারগুলোর জন্য এক অপূরণীয় ও মর্মান্তিক বেদনার সৃষ্টি করেছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য ভাণ্ডার পর্যালোচনা করে জানা গেছে যে, চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে শুরু করে আজ বুধবার সকাল পর্যন্ত সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা জুড়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১০৭ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, যার মধ্যে মর্মান্তিক সত্য হলো এর মধ্যে ১০৬ জনই একেবারে অবুঝ ও কোমলমতি শিশু। তবে স্বাস্থ্য বিভাগের চিকিৎসকরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে জানিয়েছেন যে, এত বিপুল সংখ্যক শিশুর মৃত্যু হলেও এর মধ্যে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে মাত্র চারজন শিশুর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে যে তারা সরাসরি হাম রোগেই আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল। বাকি মৃত শিশুদের ক্ষেত্রে হামের তীব্র উপসর্গ, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া এবং অন্যান্য জটিল শারীরিক সংকটের লক্ষণ স্পষ্টভাবে বিদ্যমান ছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ হলেও সময়মতো টিকাদান এবং সচেতনতার অভাবে এই রোগটি বর্তমানে সিলেট অঞ্চলের শিশুদের জন্য এক নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে, যা অভিভাবক সমাজকে চরমভাবে আতঙ্কিত করে তুলেছে।

বিভাগীয় এই ভয়াবহ মৃত্যুর পরিসংখ্যানের দিকে গভীরভাবে তাকালে দেখা যায় যে, সিলেট বিভাগের চার জেলার মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলায় পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি শোচনীয় ও ত্রাস সৃষ্টি করেছে। কেবল সুনামগঞ্জ জেলাতেই হামের উপসর্গ ও সংশ্লিষ্ট জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে সর্বমোট ৪৭ জন শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে, যা পুরো বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড। এছাড়া সিলেট জেলায় এই প্রাণঘাতী উপসর্গে মারা গেছে ৩৬ জন শিশু, মৌলভীবাজার জেলায় প্রাণ হারিয়েছে ১৩ জন এবং হবিগঞ্জ জেলায় এই সংখ্যাটি গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১১টিতে। প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদে স্বাস্থ্য সচেতনতার চরম অভাব, টিকা দানের কার্যক্রমে ঘাটতি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয়ে বিলম্বের কারণেই মূলত সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলার বিভিন্ন এলাকায় এই মৃত্যুর মিছিল এত দীর্ঘ হয়েছে বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে এক একটি পরিবারের বুকফাটা আর্তনাদ এবং কান্নার রোল পুরো সমাজকে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার পরও থামছে না এই শিশুমৃত্যুর নির্মম ধারা।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা যে কতটা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে, তা সাম্প্রতিক ২৪ ঘণ্টার হাসপাতালে নতুন রোগী ভর্তির তথ্য লক্ষ্য করলেই পরিষ্কার হয়ে যায়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে জানানো হয়েছে যে, কেবল গত ২৪ ঘণ্টার স্বল্প সময়ে নতুন করে ৭১ জন শিশু হামের তীব্র উপসর্গ ও শারীরিক জটিলতা নিয়ে সিলেটের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে ভর্তি হয়েছে। এই আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক রোগী বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে, যেখানে ২৮ জন শিশু জীবনের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। এছাড়া নগরীর শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালেও ২৭ জন শিশু গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে। শুধু বিভাগীয় শহরের বড় হাসপাতালেই নয়, বরং মফস্বল এলাকার চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতেও রোগীর উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যার মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ৮ জন, মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ৪ জন, সিলেটের স্বনামধন্য রাগীব-রাবেয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৩ জন এবং জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হামের উপসর্গ নিয়ে একজন শিশু রোগী বর্তমানে চিকিৎসাধীন থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করছে।

হাসপাতালগুলোর শিশু ওয়ার্ডে তিল ধারণের ঠাঁই নেই এবং শয্যা সংকটের কারণে অনেক গরিব ও অসহায় রোগীকে হাসপাতালের মেঝেতে কিংবা বারান্দায় থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে, যা সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার এক অত্যন্ত করুণ ও অমানবিক ছবি তুলে ধরে। হামের মতো একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে শিশুদের রক্ষা করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করা হলেও মাঠপর্যায়ে এর সঠিক বাস্তবায়ন এবং সচেতনতার প্রচারে ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। বিশেষ করে পাহাড়ি ও হাওর অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে যে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তা দ্রুত দূর না করা গেলে এই মৃত্যুর মিছিল আরও দীর্ঘ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অবিলম্বে সিলেট বিভাগের প্রতিটি গ্রাম ও মহল্লায় বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা, অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন প্রতিটি শিশুর জন্য পর্যাপ্ত ওষুধপত্র ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত