প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকতের শহর কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম বলেছেন, কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, জীববৈচিত্র্য এবং পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এটিকে একটি আধুনিক ও টেকসই পর্যটন নগরীতে রূপান্তর করা হবে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের আওতাধীন হোটেল ও পর্যটন স্থাপনাগুলোর আধুনিকায়নের উদ্যোগ ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সচিবালয়ে অর্থ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে কক্সবাজার জেলার ভবিষ্যৎ সমন্বিত উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনা সংক্রান্ত এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় এসব কথা বলেন তিনি। সভায় কক্সবাজারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা, পর্যটন অবকাঠামো, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্মার্ট সিটি গঠনের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিমানমন্ত্রী আফরোজা খানম বলেন, কক্সবাজারের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হবে না; বরং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ইকো-ট্যুরিজম মডেল অনুসরণ করা হবে। তিনি উল্লেখ করেন, পর্যটনের বিকাশের পাশাপাশি সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, বনাঞ্চল এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সুরক্ষা নিশ্চিত করাও সরকারের অগ্রাধিকার। এজন্য সরকারি-বেসরকারি খাত, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং খুব শিগগিরই এটি উদ্বোধন করা সম্ভব হবে বলে সরকার আশাবাদী। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু হলে বিদেশি পর্যটকদের সরাসরি কক্সবাজারে আসার সুযোগ তৈরি হবে। এতে পর্যটন শিল্পে নতুন গতি আসবে, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু হলে কক্সবাজার দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা আরও বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে বিদেশি পর্যটকদের একটি বড় অংশকে ঢাকার মাধ্যমে কক্সবাজারে যেতে হয়। সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে ভ্রমণের সময় ও ব্যয় কমবে, যা পর্যটকদের জন্য বড় সুবিধা হবে।
সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কক্সবাজারের ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে পরিকল্পিত ও টেকসই করতে নতুন একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হবে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এমন একটি পরিকল্পনা নেওয়া হবে, যাতে কক্সবাজারকে আধুনিক, নিরাপদ এবং আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন হাবে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়।
তিনি বলেন, দ্রুত নগরায়ন ও পর্যটনের সম্প্রসারণের ফলে কক্সবাজারে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হচ্ছে। তাই অপরিকল্পিত উন্নয়নের পরিবর্তে সুপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
সভায় আলোচনায় উঠে আসে, কক্সবাজারে পর্যটকদের জন্য উন্নত আবাসন, আন্তর্জাতিক মানের সেবা, আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্ন সৈকত, নিরাপত্তা এবং বিনোদনের সুযোগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ এবং পর্যটনভিত্তিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়।
পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করতে উপকূলীয় পরিবেশ, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এবং বনাঞ্চল সংরক্ষণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পর্যটনের বিকাশের সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও আকর্ষণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সভা শেষে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রস্তাবনা সমন্বয় করে কক্সবাজারকে স্মার্ট সিটি হিসেবে গড়ে তুলতে দ্রুত একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, কক্সবাজারের উন্নয়ন শুধু একটি জেলার উন্নয়ন নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, পর্যটন শিল্প এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই পরিকল্পিত উন্নয়ন বাস্তবায়নে সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত, প্রবাল দ্বীপ, পাহাড়, বনাঞ্চল এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতির কারণে কক্সবাজার বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পর্যটন অঞ্চল। তবে এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে উন্নত অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক মানের সেবা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কার্যকর পরিকল্পনার বিকল্প নেই। সরকারের নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজার শুধু দেশীয় পর্যটকদের নয়, আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছেও আরও আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু, পর্যটন অবকাঠামোর আধুনিকায়ন, স্মার্ট সিটি পরিকল্পনা এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজারে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ, বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি এবং জাতীয় অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের অবদান আরও শক্তিশালী হবে। সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী পরিকল্পনাগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজার ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আধুনিক, পরিবেশবান্ধব এবং আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন হাবে পরিণত হওয়ার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।