প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে সিএনজিচালিত যানবাহনের চালক, ফিলিং স্টেশন মালিক এবং সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত ভাসমান এলএনজি (লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস) টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় ঢাকার প্রায় সব সিএনজি ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ যানবাহনের সারি দেখা গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক চালক প্রয়োজনীয় গ্যাস সংগ্রহ করতে পারছেন না। এতে শুধু পরিবহন খাত নয়, রাজধানীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রাও ব্যাহত হচ্ছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যার কারণে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্প, বিদ্যুৎ ও সিএনজি খাতে। বিশেষ করে রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কমে যাওয়ায় সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, ভোর হওয়ার আগেই অনেক সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে গাড়ির দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। অনেক চালক রাত থেকেই লাইনে অবস্থান করছেন, যাতে সকালে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু সীমিত সরবরাহের কারণে বহু চালক দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও খালি হাতে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। কোথাও কোথাও সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং রাইড-শেয়ারিং সেবার সঙ্গে যুক্ত চালকদের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের ভাষ্য, প্রতিদিনের একটি বড় সময় গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে তারা যাত্রী পরিবহন করতে পারছেন না। ফলে স্বাভাবিক আয় মারাত্মকভাবে কমে গেছে। অনেক চালক জানিয়েছেন, দৈনিক আয়ের বড় অংশই নির্ভর করে কত দ্রুত গ্যাস নিয়ে রাস্তায় নামা যায় তার ওপর। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দিনের উল্লেখযোগ্য সময় পাম্পে কাটিয়ে দিতে হচ্ছে।
নিম্ন ও মধ্যম আয়ের চালকদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। অনেকেই কিস্তিতে গাড়ি কিনেছেন বা ভাড়ায় চালান। দৈনিক নির্ধারিত জমা দেওয়ার পাশাপাশি পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করতে হয় তাদের। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে আয় কমে যাওয়ায় তারা আর্থিক চাপের মুখে পড়েছেন। কয়েকজন চালক জানান, একদিনে যত সময় রাস্তায় থাকার কথা, তার বড় অংশ এখন গ্যাসের লাইনে নষ্ট হচ্ছে।
সংকটের প্রভাব সাধারণ যাত্রীদের ওপরও পড়েছে। পর্যাপ্ত সিএনজিচালিত যানবাহন রাস্তায় না থাকায় অনেক এলাকায় যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বিশেষ করে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং জরুরি কাজে বের হওয়া ব্যক্তিরা বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে যানবাহনের সংকটের কারণে বিকল্প পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, ফলে যাতায়াত ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।
এদিকে কিছু চালক অভিযোগ করেছেন, অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে তারা আশঙ্কা করছেন যে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ভবিষ্যতে গ্যাসের মূল্য সমন্বয়ের পরিবেশ তৈরি করা হতে পারে। যদিও এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন অভিযোগের যথাযথ তদন্ত এবং স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা জরুরি, যাতে জনমনে বিভ্রান্তি না ছড়ায়।
শুধু চালকরাই নন, সংকটে ক্ষতির মুখে পড়েছেন সিএনজি ফিলিং স্টেশন মালিকরাও। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় অনেক স্টেশন পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হতে পারছে না। ফলে বিক্রি কমে যাওয়ার পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা দ্রুত এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক করে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের চাপ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় এলএনজি টার্মিনালের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। ফলে এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে তার প্রভাব দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তারা মনে করেন, ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট এড়াতে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা, টার্মিনালের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, গ্যাস সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন শুধু পরিবহন খাত নয়, শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দ্রুত কারিগরি সমস্যা সমাধান এবং স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
এদিকে জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ ধীরে ধীরে আগের অবস্থায় ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে ততক্ষণ পর্যন্ত রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভোগান্তি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।