প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় শিক্ষার আলো ছড়ানোর পবিত্র দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে যিনি মানুষ গড়ার কারিগর হওয়ার কথা ছিলেন, তিনিই আজ এক নিষ্পাপ শিশুর শৈশব ও ভবিষ্যৎ চিরতরে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত। কোমলমতি এক চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রীকে প্রলোভন ও ভয়ভীতি দেখিয়ে ধর্ষণের মতো নিকৃষ্ট অপরাধ সংঘটিত করার অভিযোগ উঠেছে হাসাননগর আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, এই পৈশাচিক ঘটনার পর মুখ বন্ধ রাখতে ওই শিশুর হাতে মাত্র বিশটি টাকা গুঁজে দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সমাজে লজ্জাজনক এই ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে পরবর্তীতে মাঠে নামে স্থানীয় এক সাবেক জনপ্রতিনিধি, যিনি টাকার বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করে উল্টো ভুক্তভোগী পরিবারকে মারধর করেন। আইনের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক ও তার সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হলেও জনমনে ক্ষোভ আর প্রতিবাদের আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী শিশুটি ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার হাসাননগর আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী। ঘটনার দিন গত ১৬ জুলাই দুপুরে যথারীতি স্কুল ছুটির পর অন্যান্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতো সেও হাসিমুখে বাড়ির পথ ধরেছিল। কিন্তু বিদ্যালয়ের প্রধান গেট পার হওয়ার আগেই তার ওপর নজর পড়ে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক মো. মহিউদ্দিনের। সুকৌশলে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে শিশুটিকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় বিদ্যালয়ের তিন তলার একটি নির্জন কক্ষে। যেখানে কেউ ছিল না, সেই নিরিবিলি পরিবেশকে সুযোগ হিসেবে বেছে নিয়ে প্রধান শিক্ষক নামক এই লম্পট শিশুটির ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। অবুঝ শিশুটি নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করলে এবং চিৎকার দিতে চাইলে তার মুখ চেপে ধরে ভয়ভীতি দেখানো হয়। পাশবিক নির্যাতন শেষে কাউকে কিছু না বলার জন্য প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে তার হাতে মাত্র বিশ টাকা ধরিয়ে দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে আসার পর শিশুটির অস্বাভাবিক চলাফেরা এবং তার চোখে-মুখে ভয়ের ছাপ দেখে পরিবারের সন্দেহ হয়। স্বজনরা তাকে পরম আদরে ও কৌতূহলে ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে এবং প্রধান শিক্ষকের কুৎসিত আচরণের আদ্যোপান্ত খুলে বলে। শিশুটির মুখ থেকে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের এমন পৈশাচিকতার কথা শোনার পর তার পুরো পরিবার শোকে ও ক্ষোভে স্তব্ধ হয়ে পড়ে। কী করবেন বুঝতে না পেরে প্রথমে স্থানীয় মাতব্বর ও হাসাননগর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য মো. বাচ্চুর শরণাপন্ন হন তারা। এলাকার একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি ন্যায়বিচার করবেন কিংবা সঠিক সমাধান দেবেন—এমনটাই আশা করেছিলেন হতভাগ্য পরিবারটি। কিন্তু সমাজের এই প্রভাবশালী ব্যক্তি দুর্নীতির পথ বেছে নেন এবং ঘটনাটি প্রকাশ না করে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য গোপন পায়তারা শুরু করেন।
অভিযোগ রয়েছে, গত বুধবার রাতে সাবেক ইউপি সদস্য মো. বাচ্চু ভুক্তভোগী শিশুর বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হন এবং ঘটনাটি মাত্র দশ হাজার টাকার বিনিময়ে রফাদফা করার জন্য পরিবারটির ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেন। কিন্তু দ্বিগুণ নৈতিকতাসম্পন্ন শিশুটির পরিবার সেই অনৈতিক প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সাবেক ইউপি সদস্য বাচ্চু ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা ভুক্তভোগী পরিবারটির ওপর চড়াও হন এবং তাদের বেধড়ক মারধর করেন। সমাজের বিচারপ্রার্থী একটি অসহায় পরিবারকে এভাবে ক্ষমতার জোরে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা এলাকার সাধারণ মানুষকে চরমভাবে ক্ষুব্ধ করে তোলে। নিরুপায় হয়ে ভুক্তভোগীর দাদা বাদী হয়ে বোরহানউদ্দিন থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। পুলিশ কালক্ষেপণ না করে দ্রুত পদক্ষেপে নামে এবং বোরহানউদ্দিন উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে প্রধান অভিযুক্ত শিক্ষক মহিউদ্দিন ও তার সহযোগী সাবেক ইউপি সদস্য বাচ্চুকে গ্রেপ্তার করে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ভুক্তভোগী শিশুটি তার ওপর ঘটে যাওয়া নির্মমতার বর্ণনা দিয়ে বলে যে, বিদ্যালয় ছুটির পর মহিউদ্দিন স্যার তাকে তিন তলায় ডেকে নিয়ে গিয়ে টেবিলের ওপর শুইয়ে তার পরিহিত পোশাক খুলে ফেলেছিল। সে যখন নিজেকে ছাড়ানোর জন্য চিৎকার দিতে চেয়েছিল, তখন স্যার তার মুখ শক্ত করে চেপে ধরেছিল। পরে কাউকে এই ঘটনা জানালে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে বিশ টাকা হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অবুঝ এই শিশুর আকুতি এবং কান্না ছুঁয়ে গেছে সমাজের প্রতিটি বিবেকবান মানুষের হৃদয়। এই জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িতদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া চলবে না এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে বলে জোর দাবি জানিয়েছে ভুক্তভোগীর পরিবার ও এলাকাবাসী। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি শিক্ষকরাই এমন জান্তব রূপ ধারণ করেন, তবে কোমলমতি শিশুরা কোথায় নিরাপদ থাকবে—এই প্রশ্ন এখন সর্বত্র ঘুরপাক খাচ্ছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বোরহানউদ্দিন থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান গণমাধ্যমকে জানান যে, গ্রেপ্তারকৃত মহিউদ্দিন এই ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। অন্যদিকে সহযোগী আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সাবেক ইউপি সদস্য বাচ্চুকে, যিনি মূল অপরাধীকে বাঁচাতে এবং ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে অবৈধভাবে রফাদফার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। পুলিশি কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গত বুধবার বিকেলে গ্রেপ্তারকৃত উভয় আসামিকে যথাযথ নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিক আইনগত প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে এবং এই মর্মান্তিক ঘটনার সাথে অন্য কেউ জড়িত রয়েছে কি না বা নেপথ্যে আর কী রহস্য আছে, তা উদ্ঘাটনে পুলিশের তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।