বিরোধী শূন্য নির্বাচনের পাঁয়তারা নিকারাগুয়ায়, তীব্র সমালোচনার ঝড়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬
  • ১৩ বার
বিরোধী শূন্য নির্বাচনের পাঁয়তারা নিকারাগুয়ায়, তীব্র সমালোচনার ঝড়

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ল্যাটিন আমেরিকার দেশ নিকারাগুয়ায় গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক বহুত্ববাদ আজ এক গভীর ও নজিরবিহীন সংকটের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে লৌহকঠিন হাতে দেশ শাসন করে চলা বর্তমান প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ওর্তেগার প্রশাসন দেশটির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার লক্ষ্যে এক চূড়ান্ত ও একনায়কসুলভ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চলেছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, দেশের সরকার নিয়ন্ত্রিত জাতীয় পরিষদে খুব শীঘ্রই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে আগামী যেকোনো জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করার একটি অত্যন্ত বিতর্কিত এবং কঠোর প্রস্তাব নিয়ে জোরেশোরে আলোচনা চলছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এবং সরকারের পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহেই এই কালাকানুন পাসের লক্ষ্যে জাতীয় পরিষদে চূড়ান্ত ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ল্যাটিন আমেরিকার এই দেশটিতে রাজনৈতিক ভিন্নমত এবং বিরোধীদের টুটি চেপে ধরার এই সর্বশেষ উদ্যোগ কেবল নিজ দেশের রাজনীতিকেই উত্তপ্ত করে তোলেনি, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তীব্র প্রতিক্রিয়া ও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

নিকারাগুয়ার বর্তমান রাজনৈতিক এই চরম পরিস্থিতির মূল পটভূমি রচিত হয়েছে মূলত দেশটির দীর্ঘমেয়াদি প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ওর্তেগার সাম্প্রতিক কিছু উগ্র ও হুমকিধমকিপূর্ণ মন্তব্যের মধ্য দিয়ে। মাত্র কিছুদিন আগে এক প্ররোচনামূলক ভাষণে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে, ভবিষ্যতে দেশের সরকার বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের কোনো বিন্দুমাত্র সুযোগ বা সম্ভাবনা তৈরি করার জন্য আর কোনো অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে না। তাঁর এই ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী মানসিকতা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক ওর্তেগার এই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন যে, নিকারাগুয়ার প্রতিটি নাগরিকের—নির্বিশেষে তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ কী—স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার এবং যেকোনো গণতান্ত্রিক নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে, যা কোনোভাবেই হরণ করা যায় না। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই আহ্বান ও প্রতিবাদের তোয়াক্কা না করে ওর্তেগা প্রশাসন তাদের দমনপীড়নমূলক নীতি আরও জোরালোভাবে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে চলেছে।

বয়সের ভারে ন্যুব্জ আশির বছর বয়সী ড্যানিয়েল ওর্তেগা ২০০৭ সাল থেকে দীর্ঘ সময় ধরে নিকারাগুয়ার রাষ্ট্রক্ষমতা একচ্ছত্রভাবে দখল করে আছেন এবং তাঁর এই সুদীর্ঘ শাসনামলে দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ ক্রমেই আরও বেশি কঠোর, রুদ্ধশ্বাস ও নিপীড়নমূলক হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর দীর্ঘ শাসনামলে অসংখ্য রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিরোধীদের মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে কারাবন্দী করা হয়েছে, বহু নেতাকর্মী ও বুদ্ধিজীবী দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন এবং সরকারের সমালোচনাকারী অনেক নাগরিকের নাগরিকত্ব পর্যন্ত অন্যায়ভাবে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি ১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক সানদিনিস্তা বিপ্লবের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক সরকারি অনুষ্ঠানে ভাষণ দেওয়ার সময় ওর্তেগা বিরোধীদের বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ ও কঠোর অবস্থানের কথা অকপটে প্রকাশ করেন। স্মরণ করা যেতে পারে যে, সেই ঐতিহাসিক বিপ্লবের সময় তিনি যে বামপন্থী সানদিনিস্তা দলের গর্বিত সদস্য ছিলেন, সেই একই দল তৎকালীন সময়কার যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত নৃশংস স্বৈরশাসক আনাস্তাসিও সোমোসাকে গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল।

কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই বিপ্লবের সুফল আজ সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে মোড় নিয়েছে এবং বিপ্লবের অন্যতম নায়ক নিজেই আজ এক নতুন স্বৈরশাসকে পরিণত হয়েছেন। সাম্প্রতিক ভাষণে ওর্তেগা কোনো প্রমাণ ছাড়াই তীব্র অভিযোগ করেন যে, বিদেশি শক্তি বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠী দেশে নানা ধরনের গোপন ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে এবং আগামী দিনে যেকোনো মূল্যে নির্বাচন জয়ের জন্য নতুন নতুন সংগঠন গড়ে তোলার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি দম্ভোক্তি প্রকাশ করে বলেন যে তথাকথিত এই অভ্যুত্থানকারীদের সম্পূর্ণভাবে প্রতিহত করার জন্য এবং তাদের সমস্ত পরিকল্পনা নস্যাৎ করার উদ্দেশ্যে সরকার একটি শক্তিশালী ও দুর্ভেদ্য আইনি দেয়াল তৈরি করবে। তাঁর সাফ কথা হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে যত বিশাল অঙ্কের অর্থই তারা পান না কেন, দেশের বিরোধীরা কোনো দিনই পুনরায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হবে না। ওর্তেগার এই ধরনের প্রকাশ্য ও কর্তৃত্ববাদী বক্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এর তীব্র নিন্দা জানান এবং বলেন যে এই মন্তব্যগুলো নিকারাগুয়া সরকারের দীর্ঘদিনের মুখোশ উন্মোচন করে তাদের আসল কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী চরিত্র বিশ্ববাসীর সামনে অত্যন্ত নগ্নভাবে প্রকাশ করে দিয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও মন্তব্য করেন যে ড্যানিয়েল ওর্তেগা এবং তাঁর স্ত্রী রোসারিও মুরিয়ো—যাকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে সহ-রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল—তারা এখন আর ন্যূনতম জনসমর্থন বা জনপ্রিয়তার ভানটুকু করার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করছেন না। তবে এসব আন্তর্জাতিক সমালোচনা ও নিন্দা সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়ে নিকারাগুয়ার জাতীয় পরিষদের প্রধান গুস্তাভো পোররাস নির্লজ্জের মতো সমস্ত প্রতিবাদ প্রত্যাখ্যান করেছেন। সরকারপন্থী একটি প্রভাবশালী গণমাধ্যমকে দেওয়া সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে দেশের আইনসভা এবং সর্বোচ্চ নির্বাচন কর্তৃপক্ষ বর্তমানে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে কীভাবে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর স্বাধীনভাবে সংগঠিত হওয়ার সমস্ত সুযোগ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া যায়। দেশের সাংবিধানিক ও আইনি কাঠামোর অপব্যবহার করে কীভাবে একটি বিরোধীশূন্য একদলীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যায়, তারই চূড়ান্ত নকশা এখন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে বসে আঁকা হচ্ছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা অভিমত প্রকাশ করছেন।

নিকারাগুয়ার বিগত সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে, যে নির্বাচনে ড্যানিয়েল ওর্তেগা অত্যন্ত বিতর্কিতভাবে পুনরায় বিজয়ী হয়েছিলেন। তবে সেই নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে শুরু থেকেই দেশজুড়ে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছিল, কারণ বিরোধী দলগুলোর স্পষ্ট অভিযোগ ছিল যে নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে সরকারের পক্ষ থেকে সমস্ত সম্ভাব্য শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরিকল্পিতভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল অথবা দেশ ছেড়ে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। এর ফলে বিরোধী দলের বহু নেতাকর্মী জেলখানার অন্ধকূপে দিন কাটাতে বাধ্য হন এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে কেবল সরকারের অনুগত ও কম পরিচিত কিছু নামমাত্র প্রার্থীকে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যাদের কোনোভাবেই বড় ধরনের জনসমর্থন পাওয়ার বা বর্তমান সরকারকে চ্যালেঞ্জ করার ন্যূনতম সম্ভাবনা ছিল না। এখানেই থেমে থাকেনি ওর্তেগা প্রশাসন, বরং ২০২৫ সালের নভেম্বরে জাতীয় পরিষদের মাধ্যমে একটি অত্যন্ত বিতর্কিত সাংবিধানিক সংস্কার অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হয়, যার মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের নির্ধারিত মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে সরাসরি ছয় বছর করা হয়। এই নতুন ব্যবস্থার অধীনে রোসারিও মুরিয়োকে ‘সহরাষ্ট্রপতি’ হিসেবে পাকাপাকিভাবে বসানো হয়, যাতে করে যেকোনো শারীরিক অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে ড্যানিয়েল ওর্তেগাকে আকস্মিকভাবে দায়িত্ব পালনে অক্ষম ঘোষণা করা হলেও মুরিয়োর ক্ষমতা গ্রহণের সাংবিধানিক পথ সম্পূর্ণ নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন থাকে।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ঐতিহাসিক সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভ অত্যন্ত নির্মমভাবে দমন করার সময় সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর নির্বিচারে চালানো গুলিতে তিন শতাধিক সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। সেই ভয়াবহ রক্তপাতের পর থেকে নিকারাগুয়ার সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রকাশ্যে সরকারের বিরুদ্ধে টু শব্দ করা বা কোনো ধরনের বিরোধী অবস্থান নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে, কারণ সামান্য প্রতিবাদের জন্য চরম মূল্য দিতে হয়। তবে দেশের অভ্যন্তরে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য হলেও বিদেশে নির্বাসনে জীবনযাপনকারী বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা ওর্তেগার এই নতুন সর্বগ্রাসী উদ্যোগের তীব্র ও কঠোর সমালোচনা অব্যাহত রেখেছেন। বিশিষ্ট বিরোধী নেতা হুয়ান সেবাস্তিয়ান চামোরো সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে বর্তমান সরকারের এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপ অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করে যে ড্যানিয়েল ওর্তেগা আদতে পুরো নিকারাগুয়াকে কিউবা, চীন কিংবা উত্তর কোরিয়ার আদলে একটি কঠোর একদলীয় রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করতে চান, যেখানে ভিন্নমতের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। এছাড়া ওর্তেগা সরকারের আমলে দীর্ঘদিন কারাবন্দী থাকা সাবেক বিরোধী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ফেলিক্স মারাদিয়াগা আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে এই মরিয়া উদ্যোগ থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় ওর্তেগা মূলত দেশের সাধারণ মানুষের ভিন্নমত ও চিন্তাধারাকে মারাত্মকভাবে ভয় পান। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে ওর্তেগা যতই দমনপীড়ন চালান না কেন, তিনি বুঝতে পেরেছেন যে তিনি বিরোধীদের পুরোপুরি নির্মূল করতে পারেননি এবং দেশের মানুষের মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা পরিবর্তনের অদম্য ইচ্ছা ও মুক্তির আকুলতা আজও সমানভাবে বেঁচে আছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত