প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আবাসিক গ্রাহকদের চুলায় দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাস না থাকায় রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ যানজট, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং অনেক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন বন্ধ থাকার ঘটনায় সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় এই সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল মেরামতের জন্য যুক্তরাজ্য থেকে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা বাংলাদেশে পৌঁছেছেন। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও প্রস্তুত রয়েছে। তাদের কারিগরি মূল্যায়নের পর পূর্ণাঙ্গ মেরামত কাজ শুরু হলে ধাপে ধাপে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা হচ্ছে। তবে কবে নাগাদ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি।
গত মঙ্গলবার মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। এর ফলে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এমনিতেই দেশে দৈনিক প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। নতুন সংকটের কারণে তা নেমে এসেছে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুটে। ফলে দেশের সামগ্রিক গ্যাস ঘাটতি প্রায় ৪৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে আবাসিক গ্রাহকদের ওপর। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, মিরপুর, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাসের চাপ না থাকায় স্বাভাবিক রান্নাবান্না সম্ভব হচ্ছে না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা, ইন্ডাকশন কুকার অথবা এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করছে। আবার কেউ কেউ গভীর রাতে সামান্য গ্যাসের চাপ ফিরে এলে তখন রান্নার কাজ শেষ করছেন।
মিরপুরের বাসিন্দা রানী বেগম জানান, কয়েক দিন ধরে দিনে চুলা প্রায় জ্বলছেই না। বিকেলের দিকে অল্প সময়ের জন্য গ্যাস এলেও চাপ খুব কম থাকে। বাধ্য হয়ে রাত জেগে রান্না ও প্রয়োজনীয় কাজ করতে হচ্ছে, যা পরিবারগুলোর জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও। রাজধানী এবং আশপাশের এলাকায় গত কয়েক দিন ধরে গ্যাসের জন্য শত শত যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। অনেক চালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না। কোথাও কোথাও গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে ফিলিং স্টেশনগুলো আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর বলেন, একটি সিএনজি স্টেশন স্বাভাবিকভাবে পরিচালনার জন্য অন্তত ১৫ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন হয়। অথচ বর্তমানে অনেক এলাকায় মাত্র ৪ থেকে ৫ পিএসআই এবং কোথাও ২ পিএসআইয়েরও কম চাপ পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থায় চালকদের প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
গ্যাসের ঘাটতির কারণে শিল্পখাতও বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর শিল্পাঞ্চলগুলোতে উৎপাদন কমে গেছে। অনেক কারখানা উৎপাদন সীমিত করেছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। শিল্প উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়নে বিলম্ব হবে এবং অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, তিতাসের দৈনিক গ্যাস চাহিদা প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুট। টার্মিনালে ত্রুটির আগে যেখানে প্রায় ১৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত, বর্তমানে তা কমে প্রায় ১২০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। ফলে সীমিত সরবরাহ বিভিন্ন খাতে ভাগ করে দিতে হচ্ছে।
রাজধানীর বাইরে নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও সাভারেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জে অনেক এলাকায় দিনে মাত্র দুই ঘণ্টার মতো গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দীর্ঘ সময় গ্যাস না থাকায় পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত খরচ করে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হচ্ছে। অন্যদিকে নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের স্বল্পতায় অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং সিএনজি স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের।
সাভারের আশুলিয়ায় বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে ভোর থেকেই যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। অনেক চালক জানিয়েছেন, এক ঘণ্টারও বেশি সময় অপেক্ষার পরও পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। স্টেশন মালিকদের ভাষ্য, গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটের প্রতিবাদে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে স্থানীয় বাসিন্দারা মানববন্ধন করেছেন। তারা দ্রুত সংকট নিরসন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত সেবা দিতে না পারলেও পূর্ণ বিল আদায়ের বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ক্রমবর্ধমান গ্যাস চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ও আমদানির সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি এলএনজি অবকাঠামোর নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করাও জরুরি। বিশেষ করে ভাসমান টার্মিনালগুলোতে বারবার কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে ২০১৮ সালে প্রথম ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি শুরু হয়। পরে দ্বিতীয় একটি টার্মিনাল চালু হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন সময়ে কারিগরি ত্রুটির কারণে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরোনো অবকাঠামোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিকল্প সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে।
সরকার জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল দ্রুত মেরামতের সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সাময়িক মেরামতের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন অবকাঠামো নির্মাণ এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের ওপরও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।