মার্কিন শুল্কেও রপ্তানিতে আশাবাদ, সুযোগ দেখছে বাংলাদেশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬
  • ১৬ বার
মার্কিন শুল্কেও রপ্তানিতে আশাবাদ, সুযোগ দেখছে বাংলাদেশ

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতিকে ঘিরে বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হলেও বাংলাদেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে তা বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। বরং প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক কাঠামোতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর অনেকের ওপর সমান বা আরও বেশি হারে শুল্ক আরোপ হওয়ায় মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, নতুন শুল্কব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম। কারণ, এটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়; বরং প্রায় সব প্রতিযোগী দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হয়েছে। ফলে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য আগের মতোই বহাল থাকবে এবং কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অতিরিক্ত সুবিধাও পেতে পারে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনামের পণ্যের ওপর প্রায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ হার ১০ শতাংশ। ফলে মূল্য প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তার মতে, নতুন শুল্ক কাঠামোতে বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির পরিবর্তে রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগই বেশি সৃষ্টি হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের পোশাকপণ্যে এর আগেও যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে প্রায় ১৬ শতাংশ পণ্যভিত্তিক শুল্ক কার্যকর ছিল। এর সঙ্গে নতুন দেশভিত্তিক ১০ শতাংশ শুল্ক যুক্ত হলেও মোট শুল্কভার আগের কার্যকর কাঠামোর তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনছে না। ফলে বাস্তবে রপ্তানিকারকদের জন্য অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা সীমিত।

মাহমুদ হাসান খান জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জোরপূর্বক শ্রম বা ‘ফোর্সড লেবার’ সংক্রান্ত যে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকায় সফররত মার্কিন প্রতিনিধিদল এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকেও দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে জোরপূর্বক শ্রমের কোনো প্রমাণ নেই বলে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়েছে।

তার ভাষ্য, আন্তর্জাতিক ক্রেতা, নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন কমপ্লায়েন্স সংস্থার নিয়মিত তদারকির কারণে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে শ্রম অধিকার ও কর্মপরিবেশের মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। ফলে জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তা হলো, বাংলাদেশ যেসব দেশ থেকে পোশাক শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করে, সেসব দেশের কিছু অঞ্চলে জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলের প্রসঙ্গ সামনে এসেছে। এ বিষয়ে বিজিএমইএর দাবি, বাংলাদেশ ওই অঞ্চল থেকে কোনো কাঁচামাল সংগ্রহ করে না। যদি ভবিষ্যতে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সরবরাহকারীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে প্রমাণিত অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে তাদের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করা হবে।

ব্যবসায়ীরা আরও জানান, ২০১৩ সালের রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), অ্যাকর্ড, অ্যালায়েন্স এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সহযোগিতায় কারখানাগুলোর ভবন, অগ্নি ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ পোশাক উৎপাদন ব্যবস্থার দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কঠোর কমপ্লায়েন্স, ডিউ ডিলিজেন্স এবং সরবরাহ শৃঙ্খল পর্যবেক্ষণের কারণে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পে শ্রম অধিকার ও উৎপাদন মান বজায় রাখতে নিয়মিত নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। এসব কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রপ্তানির বড় অংশই নিম্ন ও মধ্যমূল্যের পোশাকপণ্য, যা যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয় না। ফলে বাংলাদেশের পণ্য মার্কিন শিল্পের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। বরং তুলনামূলক কম দামে মানসম্মত পোশাক সরবরাহের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ভোক্তারা উপকৃত হন। এ বাস্তবতাও বাংলাদেশের রপ্তানি অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে বৈশ্বিক বাণিজ্যে শুল্কনীতি পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাসের কারণে নতুন নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ যদি উৎপাদন দক্ষতা, শ্রমমান, কাঁচামালের উৎস বৈচিত্র্য এবং পণ্যের বহুমুখীকরণে আরও জোর দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

তাদের মতে, শুধু তৈরি পোশাক নয়, হোম টেক্সটাইল, চামড়াজাত পণ্য, জুতা, প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য এবং উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনেও বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি বাণিজ্য কূটনীতি আরও শক্তিশালী করে যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ অব্যাহত রাখতে হবে।

রপ্তানিকারক সংগঠনগুলোর প্রত্যাশা, নতুন শুল্ক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নয়, বরং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আরও ত্বরান্বিত হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদন অব্যাহত রাখলে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতি ক্রেতাদের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের রপ্তানি খাত নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে সক্ষম হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত