প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বগুড়ার বহুল আলোচিত বিএনপি নেতা, আইনজীবী ও পরিবহন ব্যবসায়ী অ্যাডভোকেট মাহবুব আলম শাহীন হত্যা মামলার সাত বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো চূড়ান্ত রায় হয়নি। বিচারিক কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেও মামলার নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা নিহতের পরিবার, সহকর্মী এবং আইনজীবীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে। তারা বলছেন, একটি বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার দীর্ঘ সময় ঝুলে থাকায় শুধু একটি পরিবার নয়, ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় থাকা সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তারা মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
২০১৯ সালের ১৪ এপ্রিল রাতে বগুড়া শহরের নিশিন্দারা উপশহর এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত হন অ্যাডভোকেট মাহবুব আলম শাহীন। তিনি শুধু একজন আইনজীবীই ছিলেন না, বরং স্থানীয় রাজনীতি ও পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁর হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং পরিবহন খাতের আধিপত্য, রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে আসে।
ঘটনার দুই দিন পর নিহতের স্ত্রী আকতার জাহান শিল্পী বাদী হয়ে বগুড়া সদর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ ২০২০ সালের ৩০ জানুয়ারি প্রধান অভিযুক্ত আমিনুল ইসলামসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর আদালত ২০২৪ সালে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন এবং এরপর থেকে সাক্ষ্যগ্রহণসহ বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে চলে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ঘটনার দিন রাত প্রায় ১১টার দিকে বগুড়া শহরের উপশহর বাজার এলাকায় অবস্থান করছিলেন মাহবুব আলম শাহীন। এ সময় ৮ থেকে ৯ জনের একটি দল ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাঁর ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীরা শরীরের বিভিন্ন অংশে এলোপাতাড়ি কোপ দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে এবং পরে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। সে সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হামলা হিসেবে উল্লেখ করে তদন্ত শুরু করে।
নিহতের স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের আগে থেকেই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। পরিবারের সদস্য শাহরিয়ার জানান, বগুড়া থেকে ঢাকাগামী একটি বাসকে শেরপুর এলাকায় মালিক সমিতির পক্ষ থেকে আটকে দেওয়ার খবর পেয়ে শাহীন বাসা থেকে বের হন। পরে উপশহর বাজার এলাকায় পরিচিতজনের সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁর ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। পরিবারের দাবি, এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
নিহতের স্ত্রী আকতার জাহান শিল্পী অভিযোগ করেন, জেলা মোটর মালিক গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ ও নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে তাঁর স্বামীকে কয়েক দিন ধরেই বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। তিনি বলেন, পরিবহন ব্যবসায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল এবং সেই বিরোধই শেষ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয়।
পরিবারের আরেক সদস্য মেজবাহ আরও দাবি করেন, মোটর মালিক গ্রুপের বিরোধ ছাড়াও উপশহরের স্নিগ্ধা আবাসিক এলাকায় জমি নিয়ে তাঁর চাচার কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। এসব ঘটনার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র রয়েছে বলেও পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
স্থানীয় আইনজীবীদের মতে, চারদলীয় জোট সরকারের সময় মাহবুব আলম শাহীন বগুড়া মোটর মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সংগঠনের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে এবং পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ তীব্র হয়। প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, সেই বিরোধের ধারাবাহিকতায় পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
মামলার তদন্তে পুলিশ প্রধান অভিযুক্ত আমিনুল ইসলামসহ ১৪ জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দেয়। অভিযুক্তদের মধ্যে একজন ইতোমধ্যে মারা গেছেন। বর্তমানে বাকি আসামিদের বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আদালতে এ পর্যন্ত ২৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ২৩ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। এখন কেবল তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য গ্রহণ বাকি রয়েছে।
বগুড়ার পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আব্দুল বাছেদ জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আম্বার হোসেন বর্তমানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হলেই মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে পরিবহন মালিক গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধকে হত্যার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রসিকিউশনের দাবি, পরিকল্পনা, নির্দেশনা এবং অর্থায়নের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আদালতের কাছে সর্বোচ্চ শাস্তি চাওয়া হয়েছে।
এদিকে নিহতের পরিবারের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রধান অভিযুক্ত আমিনুল ইসলাম রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে জামিন লাভ করেছিলেন। পরে তিনি দীর্ঘ সময় পলাতক থাকলেও চলতি বছরে ঢাকা থেকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
নিহতের স্ত্রী আকতার জাহান শিল্পী বলেন, গত সাত বছর ধরে তাঁদের পরিবার শুধুমাত্র একটি ন্যায়বিচারের আশায় আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, একজন স্বামীকে হারানোর শোক কখনোই পূরণ হওয়ার নয়, কিন্তু বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে অন্তত পরিবারের কষ্ট কিছুটা লাঘব হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আদালত তথ্য-প্রমাণ ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ন্যায়সঙ্গত রায় প্রদান করবেন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, যে পরিবহন ব্যবসার আধিপত্যকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ, সেই ব্যবসায়িক কাঠামো এখনো বহাল রয়েছে। তাঁদের দাবি, সংশ্লিষ্ট পরিবহন প্রতিষ্ঠানের শতাধিক দূরপাল্লার কোচ এখনো দেশের বিভিন্ন রুটে চলাচল করছে। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেন, সে সময় তাঁদের পরিবারের পরিবহন ব্যবসা পরিচালনা করতে নানাভাবে বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল এবং কিছু সম্পত্তিও দখলের শিকার হয়।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের বক্তব্য এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। বিচারাধীন বিষয় হওয়ায় অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণের বিষয়টি আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
বগুড়া জেলা আইনজীবী সমিতির একাধিক সদস্য এবং স্থানীয় বিএনপির নেতারা মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, আলোচিত এই মামলার রায় শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং অপরাধ দমনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করবে। তারা মনে করেন, দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচারপ্রার্থী মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় আলোচিত ফৌজদারি মামলাগুলোতে সাক্ষ্যগ্রহণ, তদন্ত কর্মকর্তার অনুপস্থিতি, বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়া এবং সময়ক্ষেপণের কারণে বিচার দীর্ঘায়িত হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। তবে এমন সংবেদনশীল মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাত বছর আগে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ড এখনো বগুড়ার অন্যতম আলোচিত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার শেষ প্রান্তে এসে নিহতের পরিবার, সহকর্মী এবং আইনজীবীরা এখন আদালতের রায়ের অপেক্ষায় রয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, মামলার সকল তথ্য-প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর আদালত একটি ন্যায়সঙ্গত ও দৃষ্টান্তমূলক রায় প্রদান করবেন, যা ভবিষ্যতে এমন অপরাধ প্রতিরোধেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।