কাফরুলে দুর্বৃত্তের গুলিতে যুবদলকর্মী নিহত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬
  • ৮ বার
কাফরুলে দুর্বৃত্তের গুলিতে যুবদলকর্মী নিহত

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর বুকে নিরাপত্তার চাদর ভেদ করে অপরাধ চক্রের এমন এক নৃশংস ও লোমহর্ষক তাণ্ডব নেমে এল, যা পুরো এলাকাবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। রাতের স্তব্ধতা ভেঙে গুলির শব্দে প্রকম্পিত হয়ে উঠল রাজধানীর কাফরুল এলাকা। প্রকাশ্য রাজপথে কিংবা অলিগলির আড্ডায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা আজ চরম হুমকির মুখে। শুক্রবার রাতে কাফরুল থানাধীন মিরপুর এলাকায় সংঘটিত এক পৈশাচিক গুলিবর্ষণের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ইউসুফ আলী নামের এক প্রতিশ্রুতিশীল যুবদলকর্মী। এই আকস্মিক ও মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে শুধু একটি তাজা প্রাণই ঝরে যায়নি, বরং গুলিবৃদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন আরও দুই নিরীহ পথচারী। রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে কিংবা ব্যক্তিগত আক্রোশের জেরে ঘাতকদের এই হঠকারী ও বেপরোয়া আচরণ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির কথাই যেন নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

ঘটনার বিবরণ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার রাত তখন প্রায় এগারোটার মতো। ঘড়ির কাঁটায় রাতের গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাফরুল থানাধীন মিরপুর তেরো নম্বরের ই-ব্লকের ওপেক্স গার্মেন্টসের সামনে নিয়মিত আড্ডার আসরে বসেছিলেন স্থানীয় যুবদলকর্মী ইউসুফ আলী এবং তার কিছু রাজনৈতিক সহযোদ্ধা। প্রতিদিনের মতো সেদিনও তারা নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলেন। সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু কে জানত এই স্বাভাবিকতার আড়ালেই ওৎ পেতে আছে মৃত্যুর নিষ্ঠুর পরোয়ানা। সহযোদ্ধা মামুন মিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, আড্ডার ঠিক ওই মুহূর্তে আকস্মিক তিন থেকে চারজন অপরিচিত লোক অত্যন্ত সন্দেহজনকভাবে তাদের আশপাশে ঘোরাঘুরি করতে শুরু করে। অপরিচিত মুখগুলোর গতিবিধি এবং তাদের রহস্যজনক উপস্থিতি স্থানীয় যুবদলকর্মী ইউসুফ আলীর মনে সন্দেহের উদ্রেক করে।

পরিস্থিতি বুঝতে এবং তাদের পরিচয় নিশ্চিত করতে ইউসুফ আলী নিজেই সাহসিকতার সঙ্গে সেই অপরিচিত লোকগুলোকে ডেকে তাদের পরিচয় জানতে চান। কিন্তু অপরিচিত ওই দলটির মনে কোনো সদুদ্দেশ্য ছিল না; বরং তারা যেন কোনো পূর্বপরিকল্পিত মিশন নিয়েই সেখানে হাজির হয়েছিল। পরিচয় জানতে চাওয়ার মাত্র কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। ঘাতকরা মুহূর্তের মধ্যে তাদের সঙ্গে থাকা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র বের করে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে কানফাটা গুলির শব্দে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে এবং পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আকস্মিক এই সশস্ত্র হামলায় জীবন বাঁচাতে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। আশপাশে থাকা মানুষজন জীবন বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি শুরু করেন।

গুলির শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই ইউসুফের সহযোদ্ধা মামুন মিয়া এবং আশপাশের অন্যান্য সাহসী লোকজন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আক্রমণকারীদের ধাওয়া করেন। কিন্তু রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে এবং মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে না পেয়ে ঘাতকরা দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এরপর ঘাতকদের ধাওয়া করা লোকজন যখন আড্ডার সেই নির্দিষ্ট স্থানে ফিরে আসেন, তখন তাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক বিভীষিকাময় দৃশ্য। তারা দেখতে পান, যুবদলকর্মী ইউসুফ আলী রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছেন এবং তার দেহ থেকে অঝোরে রক্ত ঝরছে। শুধু ইউসুফ নন, তার পাশেই ফুটপাতে থাকা আরও দুই সাধারণ পথচারী গুলিবিদ্ধ হয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। পুরো দৃশ্যটি সহযোদ্ধাদের মনে গভীর শোক ও চরম ক্ষোভের জন্ম দেয়।

বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের উদ্ধার করার কাজ শুরু হয়। সহযোদ্ধারা এবং স্থানীয়রা মিলে গুলিবিদ্ধ ইউসুফ আলী এবং আহত দুই পথচারীকে দ্রুত স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে অবস্থার অবনতি ঘটলে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাদের তৎক্ষণাৎ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে স্থানান্তর করা হয়। শনিবার রাতের গভীরতায় যখন তাদের ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছানো হয়, তখন জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসকরা ইউসুফ আলীকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মৃত বলে ঘোষণা করেন। চিকিৎসকরা পরবর্তীতে নিশ্চিত করেন যে, ইউসুফের বুকের ডান পাশে অত্যন্ত কাছ থেকে অত্যন্ত মারাত্মকভাবে গুলি লেগেছিল, যা তার ফুসফুস ও হৃদপিণ্ডে আঘাত হেনেছিল এবং হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছিল।

নিহত ইউসুফ আলীর ব্যক্তিগত জীবন ও রাজনৈতিক অঙ্গনের অতীত বিশ্লেষণ করলে জানা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি অতীতে কাফরুল থানা ছাত্রদলের অত্যন্ত পরিশ্রমী ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সময়ের বিবর্তনে তিনি যুবদলের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তার পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তার মূল নিবাস ছিল বরিশালের উজিরপুর উপজেলার শাকরাল গ্রামে, তবে দীর্ঘকাল ধরে তিনি রাজধানী ঢাকার কাফরুল এলাকার পশ্চিম বাইশটেকি এলাকায় স্বপরিবারে বসবাস করতেন। একজন সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে এলাকার মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেন তিনি। তার এই আকস্মিক ও নৃশংস মৃত্যুতে তার পরিবারে শোকের মাতম চলছে এবং তার রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের মাঝে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

এই পৈশাচিক হামলায় কেবল ইউসুফ আলীই প্রাণ হারাননি, বরং ঘাতকদের বেপরোয়া গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছেন আরও দুজন সাধারণ জীবিকানির্বাহী মানুষ। তাদের একজন হলেন ফুটপাতের কাঁচামাল ব্যবসায়ী নালাম সরদার, যার বয়স পঁয়তাল্লিশ বছর। তার গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলায়। ঘটনার দিন ব্যবসার কাজ শেষে বা অন্য কোনো কাজে ওই এলাকায় অবস্থান করার সময় তিনি ঘাতকদের নিক্ষিপ্ত গুলিতে মাথার ডান পাশে মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন। অপর আহত ব্যক্তি হলেন মনির হোসেন, যার বয়স বত্রিশ বছর। তিনি পেশায় একজন ফুটপাতের কাপড় ব্যবসায়ী এবং তার বাড়ি মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলায়। এই সন্ত্রাসী হামলায় তিনি তার বাম পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে বর্তমানে চরম শারীরিক যন্ত্রণা ভোগ করছেন। এই দুই খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের অপরাধ কী ছিল, তা আজও সাধারণ মানুষের মনে এক বিরাট প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ঘটনার পরপরই ঢাকা মেডিকেল কলেজ পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ ও পরিদর্শক মো. ফারুক গণমাধ্যমকে জানান যে, নিহতের মরদেহটি সম্পূর্ণ আইনানুগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে ময়নাতদন্তের উদ্দেশ্যে সুরক্ষিত রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, গুলিতে মারাত্মকভাবে আহত অপর দুই ব্যবসায়ী জরুরি বিভাগে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকরা তাদের অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। এই ঘটনায় কাফরুল থানায় একটি হত্যা মামলা এবং অস্ত্র আইনে মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে। পুলিশ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উচ্চপর্যায়ের দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে অপরাধীদের শনাক্ত করার জন্য জোরদার তদন্ত শুরু করেছে।

রাজধানীর বুকে প্রকাশ্য রাজপথে এ ধরনের সশস্ত্র হামলা এবং রাজনৈতিক কর্মীকে গুলি করে হত্যার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আজ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন সচেতন নাগরিক সমাজ। রাতের অন্ধকারে যারা অস্ত্র উঁচিয়ে মানুষের জীবন কেড়ে নেয়, তারা সমাজের সবচেয়ে বড় শত্রু। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরক্ষভাবে জড়িত প্রতিটি অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা না হলে এ ধরনের অপরাধ প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাবে। নিহত ইউসুফ আলীর পরিবার আজ ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে, আর দেশবাসী তাকিয়ে আছে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকার দিকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত