পদত্যাগের পর আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গভবন ছাড়লেন মো. সাহাবুদ্দিন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬
  • ৭ বার
পদত্যাগের পর আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গভবন ছাড়লেন মো. সাহাবুদ্দিন

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজনীতির দীর্ঘ চড়াই-উতরাই, নানা নাটকীয়তা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এক সুদীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে দেশের রাষ্ট্রপতির পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইস্তফা দিয়েছেন মো. সাহাবুদ্দিন। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার প্রায় ২১ মাস আগেই তাঁর এই প্রস্থান দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। শারীরিক অসুস্থতা এবং নানা শারীরিক জটিলতাকে পদত্যাগের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও এর পেছনে কাজ করেছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও জনমতের চাপ। শুক্রবার বিকেলে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের দপ্তরে নিজের স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে তিনি বঙ্গভবনের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কের ইতি টানেন। এই আকস্মিক পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন এক সাংবিধানিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার গতিপ্রকৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে।

পদত্যাগপত্র পাওয়ার পরপরই জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমের সামনে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণ করার কথা ঘোষণা করেন এবং সংবিধানের সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী পরবর্তী সাংবিধানিক পদক্ষেপসমূহ ব্যাখ্যা করেন। স্পিকার জানান যে, মো. সাহাবুদ্দিন গুরুতর অসুস্থতার কারণে এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে রাষ্ট্রপতির মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের গুরুদায়িত্ব পালন করতে অপারগ হয়ে পড়ার কারণে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হওয়ায় এখন থেকে পরবর্তী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার নিজেই রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করবেন। একই সঙ্গে এই অন্তর্বর্তী সময়ে স্পিকারের দৈনন্দিন কার্যাবলি পরিচালনা করার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের ওপর।

সংবিধানের বিধান অনুযায়ী আগামী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদের সম্মানিত সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল হিসেবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন বর্তমান সংসদে তাদের মনোনীত প্রার্থীই যে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হতে যাচ্ছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কোনো সংশয় নেই। মো. সাহাবুদ্দিনের এই বিদায়ের মধ্য দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা দ্রুত পূরণ করার জন্য সংসদীয় প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। এর আগে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মনোনয়নে এবং অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। পাঁচ বছরের নির্ধারিত মেয়াদের নিয়ম অনুযায়ী তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালের এপ্রিল মাসে, কিন্তু দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও জনআকাঙ্ক্ষার মুখে তাকে নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই বঙ্গভবন ত্যাগ করতে হলো।

বঙ্গভবন ছাড়ার পর মো. সাহাবুদ্দিনের পরবর্তী গন্তব্য কোথায় হবে, তা নিয়ে নানামুখী গুঞ্জন চললেও সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে যে তিনি রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে অবস্থিত নিজের ব্যক্তিগত বাসভবনে গিয়ে উঠছেন। তাঁর এই সম্ভাব্য বিদায়ের প্রস্তুতি হিসেবে গত কয়েক দিন ধরেই ওই বাসভবনটিকে নতুন করে বসবাসের উপযোগী করে তোলার জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং গোছগাছ করার কাজ জোরেশোরে চলেছে। পরিবারের প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য জিনিসপত্র ও আসবাবপত্র ইতিমধ্যেই সেখানে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব থেকে অব্যহতি পাওয়ার পর তিনি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিবেশে নিভৃত জীবনযাপন করবেন বলে জানা গেছে। তবে তাঁর এই বিদায় কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলের নানাবিধ রাজনৈতিক সমীকরণ ও বিতর্ক।

মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর পদত্যাগপত্রে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালনের সময়কার বিভিন্ন ঘটনার একটি নিজস্ব মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি সংবিধানের প্রতি পূর্ণ অনুগত থেকে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশ এক গভীর শাসনতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক সংকটের মুখে পড়েছিল। সেই সংকটময় মুহূর্তে দেশেক বাঁচাতে এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে তিনি সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের কাছে আইনি মতামত চেয়েছিলেন এবং আদালতের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ অনুযায়ী নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করেছিলেন। তাঁর এই সুদৃঢ় ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলেই দেশে কোনো মারাত্মক সাংবিধানিক বিপর্যয় বা নৈরাজ্য ঘটেনি বলে তিনি তাঁর চিঠিতে দাবি করেছেন।

পদত্যাগপত্রে শারীরিক অসুস্থতার বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে মো. সাহাবুদ্দিন উল্লেখ করেছেন যে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে হৃদ্‌রোগ, তীব্র উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং কিডনির জটিল রোগে ভুগছেন। অতীতে তাঁর হৃদ্‌যন্ত্রে বাইপাস অস্ত্রোপচারও সম্পন্ন হয়েছে। সম্প্রতি তাঁর বিশদ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে গিয়ে চিকিৎসকরা ‘অটোনমিক নিউরোপ্যাথি’ নামক একটি জটিল রোগ শনাক্ত করেছেন, যার কারণে মাঝেমেই তিনি ক্ষণিকের জন্য চেতনা হারিয়ে ফেলেন বা ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন। শারীরিক ও মানসিক এই চরম অসামর্থ্যের কারণে রাষ্ট্রপতির মতো নিবিড় মনোযোগ ও ধকলের পদ চালিয়ে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়েছে এবং তাঁর দীর্ঘমেয়াদি ও নিবিড় চিকিৎসা প্রয়োজন। যদিও চিঠিতে কোনো রাজনৈতিক চাপ বা সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো বলপ্রয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়নি, তবুও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে এই পদত্যাগের নেপথ্যে বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর সুপ্ত চাপ এবং জনমতের প্রবল প্রভাব কাজ করেছে।

গত বুধবার থেকেই রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগের বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রধান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। সরকার ও বিরোধী দলগুলোর শীর্ষ পর্যায় থেকে নানা ধরনের বার্তা আদান-প্রদান হচ্ছিল। এমনকি তাঁর সম্ভাব্য উত্তরসূরি কে হতে পারেন, তা নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারক মহলে গোপনে আলোচনা শুরু হয়েছিল। বৃহস্পতিবার বঙ্গভবনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে মো. সাহাবুদ্দিন চলতি মাসের মধ্যেই বঙ্গভবনের সবাইকে গোছগাছ করার মৌখিক নির্দেশ দিয়েছিলেন। এমনকী রাষ্ট্রপতির দপ্তরের মনোনীত বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা তাঁদের ব্যক্তিগত মালামাল ইতিমধ্যেই সরিয়ে নিয়েছিলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে সরকারি ও চিকিৎসা সংক্রান্ত সফরে অবস্থান করছিলেন, কিন্তু এই আকস্মিক সাংবিধানিক সংকটের পূর্বাভাস পেয়ে তিনি নিজের সফর সংক্ষিপ্ত করে শুক্রবার দুপুরেই দ্রুত ঢাকায় ফিরে আসেন এবং বিকেল চারটার দিকে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিবের মাধ্যমে পাঠানো পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন।

মো. সাহাবুদ্দিনের এই নাটকীয় পদত্যাগের পর দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ড. শফিকুর রহমান এক জরুরি ব্রিফিংয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন যে, দেরিতে হলেও অবশেষে জাতির ঘাড় থেকে স্বৈরাচারের একটি কালো ছায়া চিরতরে সরে গেল। অন্যদিকে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ধারণকারী নতুন রাজনৈতিক শক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষ থেকে আরও কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়েছে। দলটির নেতারা দাবি তুলেছেন যে, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের আত্মত্যাগের সঠিক বিচার নিশ্চিত করতে হলে এবং স্বৈরাচারী ব্যবস্থার কোনো ধরনের পুনরুত্থান রোধ করতে হলে সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, এবি পার্টি এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মতো দলগুলোও আলাদা বিবৃতি দিয়ে এই পদত্যাগকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি তাঁর শাসনামলে সংঘটিত বিভিন্ন বিতর্কিত বিষয়ের নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জোরালো দাবি জানিয়েছে।

ইতিহাসের পাতায় ফিরে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগের এমন ঘটনা অত্যন্ত বিরল। এর আগে ২০০২ সালে তৎকালীন সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধের জেরে এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন এবং সে সময় স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। দীর্ঘ ২৪ বছর পর আবারও দেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল। বিগত সরকারের পতনের পর থেকেই মো. সাহাবুদ্দিনকে অপসারণের দাবিতে বিভিন্ন মহলে নানা আন্দোলন ও বিক্ষোভ সংঘটিত হয়েছিল, তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে বড় ধরনের কোনো সাংবিধানিক শূন্যতা এড়াতে তাঁকে পদে বহাল রাখা হয়েছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর অবশেষে এই অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো। এখন সমগ্র দেশবাসীর নজর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং একটি স্থিতিশীল সাংবিধানিক ধারার দিকে নিবদ্ধ রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত