যমুনার ভাঙনে ১১ বার ঠিকানা বদল, অনিশ্চয়তায় একটি স্কুল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
  • ১৩ বার
যমুনার ভাঙনে ১১ বার ঠিকানা বদল, অনিশ্চয়তায় একটি স্কুল

প্রকাশ: ২৭ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলে অবস্থিত পাতিলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় যেন নদীভাঙনের বিরুদ্ধে টিকে থাকার এক প্রতীক। প্রায় চার দশকের পুরোনো এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে বারবার যমুনা নদীর ভাঙনের শিকার হয়েছে। গত দুই দশকে অন্তত ১১ বার বিদ্যালয়টির স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। সর্বশেষ চলতি জুলাই মাসে আবারও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় বিদ্যালয়ের স্থাপনা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একের পর এক স্থানান্তরের ফলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের চর পাতিলবাড়ী গ্রামের এই বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার প্রধান ভরসা। কিন্তু যমুনার অব্যাহত ভাঙন শিক্ষার এই আলোকবর্তিকাকে বারবার সংকটে ফেলছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয়টিকেও স্থানান্তর করতে হচ্ছে। এতে স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে না এবং শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশও বারবার ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়টি ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ১৯৯১ সাল থেকে শুরু করে একাধিকবার ভাঙনের মুখে পড়ে বিদ্যালয়টি সরিয়ে নেওয়া হয়। সর্বশেষ গত ২২ জুলাই আবারও ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করলে বিদ্যালয়ের টিনশেড ভবন, আসবাবপত্র এবং শিক্ষাসামগ্রী দ্রুত নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে নতুন স্থানে অস্থায়ীভাবে পাঠদান চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

একসময় বিদ্যালয়টিতে শতাধিক শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়াশোনা করলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৫৭ জনে। স্থানীয়দের মতে, ঘন ঘন বিদ্যালয় স্থানান্তর, অনিশ্চিত অবকাঠামো এবং চরাঞ্চলের কঠিন জীবনযাত্রার কারণে অনেক পরিবার সন্তানদের অন্যত্র পাঠিয়ে দিচ্ছে কিংবা অনেক শিক্ষার্থী মাঝপথেই পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে। ফলে বিদ্যালয়টিতে ঝরে পড়ার হারও বেড়ে চলেছে।

বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। স্থায়ী ভবন নির্মাণের সুযোগ না থাকায় বাঁশ, কাঠ ও টিন দিয়ে অস্থায়ী কক্ষ তৈরি করে পাঠদান চালানো হয়। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি, কাদা ও নদীর পানির কারণে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। কখনো হাঁটুসমান পানি, কখনো বালুচর পেরিয়ে ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের স্কুলে আসতে হয়। এতে নিয়মিত উপস্থিতিও কমে যায়।

অভিভাবক নরুন্নবী বলেন, সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নদীভাঙনের আতঙ্কে পরিবারকে যেমন বারবার বসতি বদলাতে হয়, তেমনি বিদ্যালয়ও স্থানান্তরিত হওয়ায় শিশুদের শিক্ষাজীবন বারবার বিঘ্নিত হচ্ছে। আরেক অভিভাবক বাবু মিয়া জানান, বিদ্যালয়ের দুর্বল অবকাঠামো এবং দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা শিশুদের জন্য প্রতিদিনের সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা তৌহিদুল ইসলাম বলেন, চরাঞ্চলের শিশুরা এমনিতেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ সুবিধা থেকে অনেকটাই বঞ্চিত। তার ওপর বারবার নদীভাঙনে বিদ্যালয় স্থানান্তরের কারণে শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না, আবার কেউ কেউ পরিবারসহ অন্যত্র চলে যাওয়ায় পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়।

একই এলাকার বাসিন্দা ওমর আলীর মতে, নদীভাঙন শুধু একটি বিদ্যালয়কে নয়, পুরো একটি জনপদকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়। মানুষ যখন বসতি হারায়, তখন সন্তানদের শিক্ষার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই পিছিয়ে পড়ে। ফলে চরাঞ্চলের শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহবুবুর রহমান বলেন, বারবার বিদ্যালয়ের স্থাপনা সরাতে হওয়ায় শিক্ষকরা যেমন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, তেমনি শিক্ষার্থীরাও স্থায়ী পরিবেশ পাচ্ছে না। তিনি জানান, প্রতিবার নতুন করে শ্রেণিকক্ষ তৈরি, বেঞ্চ-ডেস্ক স্থানান্তর এবং পাঠদানের পরিবেশ নিশ্চিত করতে অনেক সময় ও শ্রম ব্যয় হয়। এতে শিক্ষার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি বিদ্যালয়টিকে পাঠদানের উপযোগী করতে জরুরি সরকারি সহায়তার আহ্বান জানান।

সাঘাটা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুল্লাহেস সাফি বলেন, বিদ্যালয়টি যাতে দ্রুত পাঠদানের উপযোগী করা যায়, সে জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও সহায়তার জন্য আবেদন পাঠানো হয়েছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, নদীভাঙনপ্রবণ অঞ্চলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা অবকাঠামো পরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। শুধু অস্থায়ী ভবন নির্মাণ নয়, ভাসমান বিদ্যালয়, স্থানান্তরযোগ্য আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, নিরাপদ শিক্ষা কেন্দ্র এবং নদীভাঙন ঝুঁকির ভিত্তিতে বিশেষ অবকাঠামো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে চরাঞ্চলের শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদেরও মত, জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীভাঙনের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা খাতের জন্য পৃথক অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। কারণ একটি বিদ্যালয় হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি ভবন হারানো নয়; বরং শত শত শিশুর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়া।

পাতিলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গল্প কেবল একটি বিদ্যালয়ের নয়; এটি নদীভাঙনের সঙ্গে লড়াই করে শিক্ষার আলো ধরে রাখার সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো শিশুকে বিদ্যালয়ের ঠিকানা বদলের কারণে শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়তে না হয়। নদীভাঙনের বিরুদ্ধে টিকে থাকার এই সংগ্রামে শিক্ষা যেন পরাজিত না হয়—সেটিই এখন চরবাসীর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত