প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার একটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে অফিস কক্ষে বসে একজন সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে টাকা গ্রহণ ও গুনতে দেখা যাওয়ার পর ঘটনাটি দ্রুত জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। ভিডিওটি প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে জেলা প্রশাসন।
রোববার বিকেলে প্রায় দুই মিনিট ২২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর (খ) ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপ-সহকারী কর্মকর্তা ইমরান শেখ অফিসের টেবিলে বসে একজন ব্যক্তির কাছ থেকে নগদ টাকা গ্রহণ করছেন এবং তা গুনে নিচ্ছেন। এ সময় তিনি টাকা দেওয়া ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কেও কিছু তথ্য নথিভুক্ত করতে দেখা যায়। ভিডিওতে তার বক্তব্য থেকে ধারণা পাওয়া যায়, সংশ্লিষ্ট ভূমিসংক্রান্ত আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে তিনি আশ্বাস দিচ্ছেন।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। অনেকেই সরকারি দপ্তরে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগকে রাষ্ট্রীয় সেবার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন। বিভিন্ন নাগরিক, আইনজীবী, দুর্নীতিবিরোধী কর্মী এবং সাধারণ ব্যবহারকারীরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
ভিডিওতে শোনা যায়, কর্মকর্তা আবেদনকারীকে বলছেন, “আজকে রাতে আবেদন হয়ে যাবে, সামনে রবিবার জমা হয়ে যাবে। স্যার যত তাড়াতাড়ি শুনানি দেবেন, ইনশাআল্লাহ দুই সপ্তাহের মধ্যে হয়ে যাবে।” একই সঙ্গে তিনি নিজের চাকরিজীবন প্রসঙ্গে মন্তব্য করে বলেন, “উনিও চল্লিশতম বিসিএস, আমিও চল্লিশতম বিসিএস। উনার কপাল ভালো উনি ক্যাডার হয়েছেন, আর আমি নন-ক্যাডার হয়েছি।”
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর অভিযুক্ত কর্মকর্তা ইমরান শেখ অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, ভিডিওতে দেখা অর্থ কোনো ঘুষ নয়; বরং এটি তার পূর্বে ধার দেওয়া অর্থ ফেরত নেওয়ার সময় ধারণ করা হয়েছে। তবে তিনি অর্থ প্রদানকারী ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে তার ব্যাখ্যা নিয়ে জনমনে আরও প্রশ্ন তৈরি হয়।
এদিকে বোয়ালমারী উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এর আগেও দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম রকিবুল হাসান জানান, পূর্বে আকস্মিক পরিদর্শনের সময় তাকে অফিসে অনুপস্থিত পাওয়ায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। সর্বশেষ ভাইরাল ভিডিওর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের আওতায় আনা হয়।
ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক আদেশে ইমরান শেখকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আদেশে উল্লেখ করা হয়, বরখাস্তকালীন সময়ে তিনি বিধি অনুযায়ী কেবল খোরপোষ ভাতা পাবেন এবং অভিযোগের বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত চলবে।
প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভিডিওটির সত্যতা, অর্থ লেনদেনের প্রকৃতি এবং সরকারি দায়িত্ব পালনের সঙ্গে এর সম্পর্ক বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী আরও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
বাংলাদেশে ভূমি-সংক্রান্ত সেবা সাধারণ মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবাগুলোর একটি। নামজারি, খতিয়ান সংশোধন, জমি হস্তান্তর, ভূমি উন্নয়ন কর এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ভূমি অফিসে যান। দীর্ঘদিন ধরে এ খাতে দালালচক্র, ঘুষ এবং হয়রানির অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। যদিও সরকার ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা, অনলাইন আবেদন এবং ই-নামজারির মতো বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তবুও মাঠপর্যায়ে সেবার মান নিয়ে অভিযোগ পুরোপুরি দূর হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল সেবার পাশাপাশি কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, নিয়মিত নজরদারি বৃদ্ধি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা চালু না হলে দুর্নীতির অভিযোগ কমানো কঠিন হবে। একই সঙ্গে সরকারি অফিসে সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ, অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং স্বয়ংক্রিয় সেবা প্রক্রিয়া সম্প্রসারণ করলে নগদ অর্থ লেনদেনের সুযোগ কমে আসবে।
দুর্নীতিবিরোধী বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বর্তমানে অনিয়ম প্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অতীতে যেসব ঘটনা অনেক সময় আড়ালে থেকে যেত, এখন সাধারণ মানুষের ধারণ করা ভিডিও বা তথ্য দ্রুত প্রকাশ্যে চলে আসছে। ফলে প্রশাসনের পক্ষেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ তৈরি হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেছেন, কোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই বলেছেন, সরকারি সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ যেন কোনো ধরনের অবৈধ অর্থ দিতে বাধ্য না হন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাদের মতে, সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়বে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ইমরান শেখের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের পাশাপাশি ভাইরাল ভিডিওর প্রেক্ষাপট, অর্থ লেনদেনের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট সেবাগ্রহীতার বক্তব্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হলে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
সরকারি দপ্তরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকারের মধ্যে এই ঘটনাটি আবারও আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, তদন্তের ফলাফল দ্রুত প্রকাশ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে প্রশাসনের প্রতি জনআস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।