প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলায় বিএনপির এক কর্মীকে পিটিয়ে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যার ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্য ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। নিহত রাজু আহম্মেদ (৩২) স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে দলীয় নেতারা জানিয়েছেন। পরিবারের অভিযোগ, পূর্ববিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে সংঘবদ্ধ হামলা চালিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
রোববার (২৬ জুলাই) রাত প্রায় ১১টার দিকে উপজেলার শম্ভুপুরা ইউনিয়নের চরহোগলা বালুরঘাট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় রাজুকে প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে মুন্সিগঞ্জ সদর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনার পর নিহতের পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
নিহত রাজু আহম্মেদ স্থানীয় বাসিন্দা আয়নাল হকের ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। পাশাপাশি জীবিকার জন্য একটি গরুর খামার পরিচালনা করতেন। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকায় তিনি পরিচিত ও সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
নিহতের মা সালেহা বেগম সাংবাদিকদের জানান, ঘটনার কিছু সময় আগে রাজুর এক ফুফাতো ভাইয়ের সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজনের কথা-কাটাকাটি ও পরে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে রাজু ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক হয়ে গেলেও রাত গভীর হলে একদল লোক দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের বাড়িতে হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরিবারের দাবি, হামলাকারীরা মূলত রাজুর এক আত্মীয়কে খুঁজছিল। তাকে না পেয়ে রাজুকে লক্ষ্য করে লাঠি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরিবারের সদস্যরা তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে নারী সদস্যসহ আরও কয়েকজন স্বজন হামলার শিকার হন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। হামলার সময় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং চিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন।
স্থানীয়দের সহযোগিতায় আহতদের উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। পরে রাজুর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত মুন্সিগঞ্জ সদর জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও দেখা দিয়েছে।
নিহতের বড় বোন সোনিয়া বেগম অভিযোগ করেন, তার ভাই কয়েক মাস আগে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। এরপরও স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক বিরোধ অব্যাহত ছিল। সেই বিরোধের জের ধরেই পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কোনো বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বিএনপি নেতারাও ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন এবং দ্রুত জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা ব্যক্তিগত বিরোধ কোনোভাবেই সহিংসতার কারণ হতে পারে না। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।
সোনারগাঁ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আনোয়ার হোসেন জানান, নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনে কী কারণ রয়েছে এবং কারা এতে জড়িত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নেওয়া হচ্ছে এবং সম্ভাব্য অভিযুক্তদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় পর্যায়ে ব্যক্তিগত বিরোধ, সামাজিক দ্বন্দ্ব কিংবা রাজনৈতিক মতবিরোধ অনেক সময় সহিংস ঘটনার জন্ম দেয়। এসব ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে আইনশৃঙ্খলার প্রতি জনগণের আস্থা বজায় থাকে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
এদিকে রাজু আহম্মেদের মৃত্যুর খবরে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, যে কারণেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকুক না কেন, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাদের প্রত্যাশা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হবে এবং জড়িত ব্যক্তিরা আইনের মুখোমুখি হবে।
ঘটনার পর এলাকায় পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হত্যার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।