চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে নতুন যুগের সূচনা আজ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
  • ১১ বার
চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে নতুন যুগের সূচনা আজ

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে দীর্ঘদিন ধরে প্রতীক্ষিত চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল (চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন) প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন আজ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রায় এক দশক আগে শুরু হওয়া এ প্রকল্প নানা কারণে দীর্ঘ সময় ধীরগতিতে এগোলেও সম্প্রতি বাংলাদেশ ও চীনের অর্থনৈতিক সহযোগিতায় নতুন গতি এসেছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এই অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে চট্টগ্রামের শিল্পায়ন, বৈদেশিক বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং কর্ণফুলী টানেলকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন দিগন্তের সূচনা হবে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) উদ্যোগে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ উপলক্ষে ইতোমধ্যে প্রকল্প এলাকার প্রধান প্রবেশদ্বার নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। শেষ মুহূর্তে সড়কের কার্পেটিং, সৌন্দর্যবর্ধন এবং অবকাঠামোগত প্রস্তুতির কাজ সম্পন্ন করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ২০১৪ সালে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রকল্পটির যাত্রা শুরু হয়। এরপর ২০১৬ সালে আনোয়ারা উপজেলায় প্রায় ৮০০ একর জমি অধিগ্রহণের কার্যক্রম শুরু হলেও পরবর্তী কয়েক বছর প্রকল্পের অগ্রগতি ছিল খুবই সীমিত। এ সময়ে একটি প্রশাসনিক ভবন, প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানাপ্রাচীর এবং সংযোগ সড়ক নির্মাণের মতো কিছু প্রাথমিক অবকাঠামো গড়ে ওঠে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার হওয়ার ফলে প্রকল্পটি আবারও গতিশীল হয়ে উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চলটি মূলত চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য পরিকল্পিত হলেও দেশীয় এবং অন্যান্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্যও সমানভাবে উন্মুক্ত থাকবে। উন্নত টেক্সটাইল শিল্প, ওষুধ উৎপাদন, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, রাসায়নিক শিল্প এবং অন্যান্য রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাত এখানে অগ্রাধিকার পাবে। এর ফলে দেশের শিল্পখাত আরও বৈচিত্র্যময় হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি আয় বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের নির্বাহী সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মেজর জেনারেল (অব.) মো. নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রকল্পটি ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চল আন্তর্জাতিক মানের শিল্প অবকাঠামো গড়ে তুলবে এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক উৎপাদন ও বিনিয়োগের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত করতে সহায়ক হবে।

চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের প্রতিনিধি মোহাম্মদ শাহেদ বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আসতে পারে। পাশাপাশি এক লাখেরও বেশি মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৩০টি স্পিনিং মিলসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদন, প্রকৌশল শিল্প এবং আধুনিক উৎপাদনভিত্তিক নানা খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ ইতোমধ্যে প্রকাশ করেছে একাধিক প্রতিষ্ঠান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অর্থনৈতিক অঞ্চল শুধু একটি শিল্পপ্রকল্প নয়; বরং এটি কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরের সামগ্রিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে অনুন্নত এই অঞ্চলে শিল্পকারখানা, আবাসন, লজিস্টিক সুবিধা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের আয় বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সরকার কর্ণফুলী টানেলকেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও শক্তিশালী করছে। সম্প্রতি একনেকের অনুমোদন পাওয়া দুটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের যাতায়াতে সময় ও দূরত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। একটি প্রকল্পের আওতায় আনোয়ারা থেকে বাঁশখালী হয়ে পেকুয়ার মাতামুহুরী পর্যন্ত প্রায় ৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হবে। এই সড়ক চালু হলে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার কমবে এবং ভ্রমণের সময় প্রায় এক ঘণ্টা পর্যন্ত সাশ্রয় হবে।

অন্যদিকে কালাবিবির দিঘি থেকে গাছবাড়িয়া পর্যন্ত আরেকটি সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হবে, যার মাধ্যমে কর্ণফুলী টানেল ব্যবহার করে কক্সবাজারগামী যানবাহন সহজেই মূল মহাসড়কে যুক্ত হতে পারবে। এতে যানজট কমবে, পরিবহন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং কর্ণফুলী টানেলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অর্থনীতিবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দর, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী টানেল এবং চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল—এই চারটি অবকাঠামো একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। এর ফলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম একটি নতুন শিল্প ও বাণিজ্যিক করিডরে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগও আরও শক্তিশালী হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে শুধু অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়; পাশাপাশি ব্যবসাবান্ধব নীতি, দ্রুত সেবা প্রদান, দক্ষ জনবল এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি। এসব বিষয়ে সফলতা অর্জন করা গেলে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চলে পরিণত হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, আজকের উদ্বোধনের মাধ্যমে বহু প্রতীক্ষিত এই প্রকল্প বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক যাত্রা নতুন গতি পাবে। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরকে দেশের অন্যতম আধুনিক শিল্পাঞ্চলে রূপান্তরিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত