প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে এই অভিযোগপত্র দাখিলকে বহুল আলোচিত ও স্পর্শকাতর মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদনও করা হয়েছে।
সোমবার (২৭ জুলাই) বেলা পৌনে ১১টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে অভিযোগপত্র জমা দেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন। অভিযোগটি ট্রাইব্যুনাল-১–এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক বেঞ্চে শুনানির জন্য উপস্থাপিত হওয়ার কথা রয়েছে। এখন ট্রাইব্যুনাল অভিযোগপত্র গ্রহণ, শুনানির তারিখ নির্ধারণ এবং পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেবেন।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, নিখোঁজ ও সহিংসতার অভিযোগ তদন্তের ভিত্তিতে এই মামলা প্রস্তুত করা হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থা দীর্ঘ সময় ধরে সাক্ষ্য-প্রমাণ, নথিপত্র, ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে অভিযোগপত্র প্রস্তুত করেছে বলে প্রসিকিউশন সূত্র জানিয়েছে।
মামলায় বর্তমানে ৯ জন আসামি গ্রেপ্তার অবস্থায় রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহিদুল হক, পুলিশের সাবেক উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোল্যা নজরুল ইসলাম, সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি শাহরিয়ার কবির, সাংবাদিক ফারজানা রুপা এবং সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু। এছাড়া অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য আসামিদের মধ্যে কয়েকজন দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের অংশ হিসেবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চাওয়া হয়েছে।
প্রসিকিউশনের দাবি, ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে পরিচালিত অভিযানের পাশাপাশি দেশের আরও কয়েকটি স্থানে সংঘটিত সহিংস ঘটনায় মোট ৫৮ জন নিহত হন। তদন্ত সংস্থা নিহতদের পরিচয় যাচাই ও শনাক্ত করার পর জানিয়েছে, এর মধ্যে ঢাকায় ৩২ জন, নারায়ণগঞ্জে ২০ জন, চট্টগ্রামে ৫ জন এবং কুমিল্লায় একজন নিহত হন। নিহতদের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য, চিকিৎসা নথি, আলোকচিত্র, ভিডিও এবং বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ তদন্তে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর অভিযোগে এই মামলার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অধীনেই পরিচালিত হবে। ট্রাইব্যুনাল অভিযোগপত্র গ্রহণ করলে পরবর্তী ধাপে আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং বিচারিক কার্যক্রম শুরু হবে। বিচার চলাকালে প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষ উভয়ই তাদের নিজ নিজ যুক্তি, সাক্ষ্য ও প্রমাণ আদালতে উপস্থাপনের সুযোগ পাবেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন মামলায় অভিযোগ দাখিল করা বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও এটি কোনো ব্যক্তির দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সমতুল্য নয়। আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। ফলে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক আসামিই আইনের দৃষ্টিতে নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার অধিকার রাখেন।
শাপলা চত্বরের ঘটনাটি দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে আলোচিত একটি বিষয়। বিভিন্ন সময়ে ঘটনাটির প্রকৃত চিত্র, হতাহতের সংখ্যা এবং দায়-দায়িত্ব নিয়ে ভিন্নমত ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তদন্ত সংস্থা বলছে, তারা যাচাইকৃত তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই অভিযোগপত্র প্রস্তুত করেছে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আদালতে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ পাবেন।
ট্রাইব্যুনালের পরবর্তী শুনানিতে অভিযোগ গ্রহণ, পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আদেশ এবং বিচারিক কার্যক্রমের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করা হতে পারে। মামলাটির অগ্রগতি দেশ-বিদেশে ব্যাপক আগ্রহের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিচারিক প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন হলে এটি দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।