শুল্ক উত্তেজনার মাঝেই চালু কানাডা-যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সেতু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
  • ১৬ বার
শুল্ক উত্তেজনার মাঝেই চালু কানাডা-যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সেতু

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক উত্তেজনা, শুল্ক আরোপ এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো ‘গোর্ডি হাউ আন্তর্জাতিক সেতু’ চালুর মাধ্যমে। বহু প্রতীক্ষিত এই অবকাঠামো প্রকল্প শুধু একটি নতুন সেতুই নয়, বরং উত্তর আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য করিডোরে নতুন গতি সঞ্চারের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সোমবার (২৭ জুলাই) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে কানাডার অন্টারিও অঙ্গরাজ্যের উইন্ডসর এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েটকে সংযুক্ত করা এই আধুনিক আন্তর্জাতিক সেতু।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের নতুন শুল্ক নীতির কারণে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক কিছুটা চাপের মুখে পড়লেও গোর্ডি হাউ সেতুর উদ্বোধন দেখিয়ে দিচ্ছে যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা এখনো দুই দেশের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তপথে দ্রুত ও নিরাপদ পণ্য পরিবহন নিশ্চিত করার পাশাপাশি এই সেতু উত্তর আমেরিকার সরবরাহব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

গত সপ্তাহে কানাডার অন্টারিওর উইন্ডসরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে সেতুটির উদ্বোধন করা হয়। বহু বছর ধরে চলা এই বহুমূল্যের অবকাঠামো প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হওয়াকে ঘিরে আয়োজন করা হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। সেতুটির নাম রাখা হয়েছে কানাডার কিংবদন্তি আইস হকি তারকা গোর্ডি হাউয়ের নামে। ‘মিস্টার হকি’ নামে পরিচিত এই কিংবদন্তি খেলোয়াড় দীর্ঘ সময় যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ডেট্রয়েট রেড উইংস দলের হয়ে খেলেছেন। তাঁর ক্রীড়া অবদান এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়তার স্বীকৃতি হিসেবেই নতুন আন্তর্জাতিক সেতুর নামকরণ করা হয়েছে।

গোর্ডি হাউ আন্তর্জাতিক সেতু প্রায় ১.৫ মাইল বা ২.৪ কিলোমিটার দীর্ঘ। এর মূল স্প্যান নদীর ওপর প্রায় ১৫১ ফুট বা ৪৬ মিটার উচ্চতায় নির্মিত হয়েছে, যাতে বড় জাহাজ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে। ছয় লেনবিশিষ্ট এই সেতু আধুনিক প্রকৌশল প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্মিত হয়েছে এবং এটি উত্তর আমেরিকার অন্যতম উন্নত সীমান্ত অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বৈধ পরিচয়পত্রধারী পথচারী ও সাইকেল আরোহীরাও বিনামূল্যে এই সেতু ব্যবহার করার সুযোগ পাবেন, যা সীমান্তবর্তী জনগণের যোগাযোগ আরও সহজ করবে।

মার্কিন পরিবহন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কানাডার মোট রপ্তানির ৭০ শতাংশেরও বেশি যুক্তরাষ্ট্রে যায়। ফলে উইন্ডসর-ডেট্রয়েট সীমান্ত দুই দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন হাজার হাজার ট্রাক, যাত্রীবাহী যান এবং বিপুল পরিমাণ শিল্পপণ্য এই করিডোর দিয়ে পরিবাহিত হয়। বিশেষ করে মোটরগাড়ি শিল্প, কৃষিপণ্য, যন্ত্রাংশ, উৎপাদন খাত এবং ভোক্তা পণ্যের সরবরাহে এই সীমান্তের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এতদিন ধরে প্রায় এক শতাব্দী পুরোনো অ্যাম্বাসেডর ব্রিজই ছিল বড় বাণিজ্যিক ট্রাক চলাচলের প্রধান পথ। ফলে যানজট, অপেক্ষার সময় বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়ের মতো সমস্যার মুখোমুখি হতে হতো ব্যবসায়ীদের। নতুন গোর্ডি হাউ সেতু চালু হওয়ায় বিকল্প একটি আধুনিক রুট তৈরি হলো, যা সীমান্ত পারাপারে সময় কমাবে, সরবরাহব্যবস্থা আরও কার্যকর করবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ব্যয় হ্রাসে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

২০১৮ সালে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হলেও কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে কয়েক বছরের বিলম্ব ঘটে। শ্রমিক সংকট, সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন এবং স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে নির্মাণকাজ নির্ধারিত সময়ের তুলনায় দীর্ঘায়িত হয়। সব বাধা অতিক্রম করে অবশেষে বহু-বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে। কানাডা প্রায় ৬.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে সেতুটি নির্মাণ করেছে, যা দেশটির ইতিহাসে অন্যতম বড় সীমান্ত অবকাঠামো বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক এক চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ১৫ বছর সেতু থেকে আদায় হওয়া টোলের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভাগাভাগি করবে কানাডা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই ব্যবস্থা সীমান্ত অবকাঠামোর যৌথ ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণে সহযোগিতা বাড়াবে এবং দীর্ঘমেয়াদে উভয় দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করবে।

তবে এই ইতিবাচক অগ্রগতির মধ্যেও রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডা থেকে আমদানি হওয়া কিছু পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরই প্রেক্ষাপটে অন্টারিওতে অনুষ্ঠিত সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার এবং মিশিগান অঙ্গরাজ্যের কয়েকজন প্রতিনিধির আমন্ত্রণ বাতিল করা হয়। বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন ওঠে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার অর্থনীতি পরস্পরের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। দুই দেশের মধ্যে প্রতিদিন শত শত কোটি ডলারের পণ্য ও সেবা বিনিময় হয়। তাই বাণিজ্যিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কার্যকর সীমান্ত অবকাঠামো অপরিহার্য। গোর্ডি হাউ আন্তর্জাতিক সেতু সেই লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে তারা মনে করছেন।

পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন এই সেতু শুধু ট্রাক চলাচল সহজ করবে না, বরং উত্তর আমেরিকার উৎপাদনশিল্পের সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও শক্তিশালী করবে। বিশেষ করে মোটরগাড়ি শিল্পে যন্ত্রাংশের দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে এটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং পর্যটন খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

উইন্ডসর ও ডেট্রয়েটের স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও নতুন সেতু নিয়ে আশাবাদী। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিনের যানজট এবং সীমান্তে অপেক্ষার সময় কমে গেলে ব্যবসার গতি বাড়বে, পরিবহন ব্যয় কমবে এবং দুই দেশের বাজারে পণ্য সরবরাহ আরও দ্রুত সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সীমান্ত অতিক্রম করে প্রতিদিন যাতায়াতকারী কর্মজীবী মানুষ এবং পর্যটকরাও নতুন সুবিধা পাবেন।

গোর্ডি হাউ আন্তর্জাতিক সেতুর উদ্বোধন এমন এক সময়ে হলো, যখন বিশ্বব্যাপী সরবরাহব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল ও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার মধ্যেও এই প্রকল্প উত্তর আমেরিকার অর্থনৈতিক সংযোগকে আরও শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেও দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা যে অব্যাহত রয়েছে, গোর্ডি হাউ আন্তর্জাতিক সেতুর যাত্রা তারই একটি বাস্তব প্রতীক হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত