প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মালয়ালম সুপারস্টার মাম্মুট্টির সুযোগ্য পুত্র হিসেবে চলচ্চিত্র জগতে পা রেখেছিলেন দুলকার সালমান। তবে প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পার করে তিনি অত্যন্ত সফলভাবে প্রমাণ করেছেন যে, রুপালি পর্দায় নিজের স্থায়ী আসনটি তৈরি করতে কোনো পারিবারিক পরিচয়ের ওপর তাঁকে নির্ভর করতে হয়নি। বরং সুচিন্তিত চিত্রনাট্য নির্বাচন, চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করার অনন্য ক্ষমতা এবং ভাষার কোনো প্রাচীর না রেখে বিভিন্ন অঞ্চলের সিনেমায় মুন্সিয়ানা দেখানোর মধ্য দিয়ে তিনি আজ ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয়, নির্ভরযোগ্য ও বহুমাত্রিক এক অভিনেতায় পরিণত হয়েছেন। মালয়ালম, তামিল, তেলেগু কিংবা হিন্দি—প্রতিটি ভাষার ইন্ডাস্ট্রিকেই তিনি উপহার দিয়েছেন একের পর এক স্মরণীয় ও ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র। রোমান্টিক ঘরানা থেকে শুরু করে থ্রিলার, জীবনীভিত্তিক সিনেমা কিংবা গ্যাংস্টার ড্রামা—সব জায়গাতেই তিনি নিজেকে নতুন ও ভিন্ন রূপে তুলে ধরেছেন। বহুমুখী চরিত্রে অভিনয়ের এই অদম্য স্পৃহা তাঁকে অন্য দশজন তারকার চেয়ে অনেকটাই আলাদা করেছে।
অভিনয়ের জাদুকরি ভুবনে পা রাখার আগে দুলকার সালমানের জীবনযাত্রার চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। দুবাইয়ের একটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে সফল আইটি পেশাজীবী হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। তবে করপোরেটের ঘেরাটোপ ছেড়ে নিজের ভেতরের সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করতেই তিনি অভিনয়ে আসার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। সময়ের পরিক্রমায় মালয়ালমের গণ্ডি পেরিয়ে দক্ষিণ ও উত্তর ভারতের বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্রে কাজ করে তিনি আজ মলিউডের অন্যতম সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া তারকার উচ্চাসনে আসীন হয়েছেন। দুলকারের ক্যারিয়ারের সাফল্যের মূল রহস্য লুকিয়ে আছে তাঁর নিখুঁত চরিত্র নির্বাচনের মুন্সিয়ানায়। জনপ্রিয়তার বুনো পথে নিরাপদে হেঁটে না গিয়ে তিনি বারবার বেছে নিয়েছেন ঝুঁকিপূর্ণ, ভিন্নধর্মী ও চ্যালেঞ্জিং সব গল্প। কোনো বিশেষ ভাষা, নির্দিষ্ট ঘরানা কিংবা পর্দার গতানুগতিক ইমেজের মধ্যে তিনি কখনোই নিজেকে বন্দি রাখেননি। ফলস্বরূপ তিনি আজ ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক বহুমুখী এবং আস্থার প্রতীক।
ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক সাফল্যের দিক থেকেও দুলকার সালমান এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছেন। বিভিন্ন স্বনামধন্য গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ৫৭ কোটি ভারতীয় রুপিরও বেশি। প্রতিটি সিনেমার জন্য তিনি সাধারণত আট থেকে দশ কোটি রুপি পারিশ্রমিক নিয়ে থাকেন। একাধিক চলচ্চিত্র মুক্তি, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে লাভজনক চুক্তি এবং বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডের এন্ডোর্সমেন্ট বা বিজ্ঞাপনের কারণে তাঁর বার্ষিক আয় প্রায় দশ কোটি রুপি বা তার চেয়েও বেশি। শুধু রূপালি পর্দায় অভিনয় করেই ক্ষ্যান্ত হননি, তিনি নিজেকে একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর নিজের মালিকানাধীন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ওয়েফেয়ারার ফিল্মস থেকে নির্মিত হয়েছে ‘ভারানে আভশ্যমুন্ড’, ‘কুরুপ’, ‘স্যালুট’, ‘পুঝু’, ‘কিং অব কথা’ এবং ব্লকবাস্টার হিট ‘লোকাহ: চ্যাপটার ওয়ান-চন্দ্রা’র মতো আলোচিত সব সিনেমা। এর মধ্যে মাত্র ত্রিশ কোটি রুপি বাজেটে নির্মিত ‘লোকাহ’ বিশ্বব্যাপী তিন শতাধিক কোটি রুপি আয় করে রেকর্ড গড়েছিল। রিয়েল এস্টেট খাতেও তাঁর রয়েছে বিশাল বিনিয়োগ। কোচিতে বাবার সঙ্গে যৌথ মালিকানায় তাঁর একটি কোটি টাকার বিলাসবহুল ও পরিবেশবান্ধব ভিলা রয়েছে এবং দুবাইয়ে রয়েছে একটি ১৪ কোটি টাকার প্রিমিয়াম পেন্টহাউস।
বিলাসবহুল গাড়ির প্রতি দুলকার সালমানের দুর্নিবার আকর্ষণ ও শখের কথা গোটা চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে সুপরিচিত। তাঁর সুসজ্জিত ব্যক্তিগত গ্যারেজে শোভা পাচ্ছে পোরশে ৯১১ ক্যারেরা এস, অডি কিউসেভেন, মার্সিডিজ-বেঞ্জ এসএলএস এএমজি, রেঞ্জ রোভার ভোগ, বিএমডব্লিউ এম৩ কনভার্টিবল এবং ফেরারি ৪৫৮ স্পাইডারের মতো বিশ্বের নামী দামি সব সুপারকার। শুধু চার চাকার বিলাসবহুল গাড়িই নয়, তাঁর গ্যারেজে জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বমানের সব বাইক। ট্রায়াম্ফ বোনেভিল এবং বিএমডব্লিউ আর১২০০জিএস অ্যাডভেঞ্চারের মতো শক্তিশালী মোটরসাইকেল চড়ার শখও রয়েছে তাঁর। তবে এই সফলতার মাঝেও তাঁকে কিছু আইনি জটিলতা ও বিতর্কের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ভুটান সীমান্ত দিয়ে ভারতে আমদানিকৃত বিলাসবহুল গাড়ির অবৈধ চোরাচালান চক্রের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে কাস্টমস প্রিভেন্টিভ বিভাগ তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে। কর ফাঁকি ও অবৈধ উপায়ে গাড়ি আমদানির অভিযোগ খতিয়ে দেখতেই এই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। যদিও দুলকার শুরু থেকেই দাবি করে আসছেন যে তাঁর সংগ্রহে থাকা প্রতিটি গাড়ি সম্পূর্ণ বৈধ আইনি প্রক্রিয়ায় কেনা হয়েছে, তবুও এই বিষয়ে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে।
অভিনয় জীবনের ঝুলিতে তিনি জমিয়েছেন অসংখ্য মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার। পাঁচটি ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডস সাউথ, একটি কেরালা স্টেট ফিল্ম অ্য়াওয়ার্ড, কেরালা ফিল্ম ক্রিটিকস অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড এবং গাদ্দার তেলেঙ্গানা স্টেট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডসহ বহু সম্মাননা তাঁর মুকুটে যুক্ত হয়েছে। ফিল্মফেয়ারের করা তাঁর সেরা বারোটি সিনেমার তালিকার মধ্যে রয়েছে ‘উস্তাদ হোটেল’, ‘ব্যাঙ্গালোর ডেজ’, ‘চার্লি’, ‘ওকে কানমণি’, ‘কাম্মাট্টিপাডাম’, ‘কারওয়া’, ‘মহানটি’, ‘কুরুপ’, ‘সীতা রামম’, ‘লাকি ভাস্কর’, ‘চুপ: রিভেঞ্জ অব দ্য আর্টিস্ট’ এবং ‘কিং অব কথা’। রোমান্স থেকে শুরু করে থ্রিলার বা গম্ভীর চরিত্রে তাঁর অভিনয় প্রতিটি সিনেমাকেই এক অনন্য উচ্চতা দিয়েছে। ব্যক্তিগত জীবন ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের নানামুখী পথপরিক্রমা পেরিয়ে দুলকার সালমান আজ চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে এক চিরসবুজ ও অসামান্য তারকার নাম, যিনি প্রতিনিয়ত নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়তে ভালোবাসেন।