প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বৈশ্বিক অর্থনীতি ও দেশীয় মুদ্রাবাজারের নানা প্রতিকূলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জের মাঝেও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির নিঃশ্বাস হয়ে বারবার ফিরে আসছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। ব্যাংকিং চ্যানেলে বিগত টানা দুই অর্থবছর ধরেই প্রবাসী আয়ে এক অভাবনীয় ও রেকর্ড ভাঙা উচ্চ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে নতুন প্রাণশক্তি যুগিয়েছে। সদ্য শুরু হওয়া নতুন অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের শুরু থেকেই সেই ধারাবাহিক ও গতিশীল ঊর্ধ্বমুখী ধারা অত্যন্ত জোরালোভাবে বজায় রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ করা পরিসংখ্যান ও সাম্প্রতিক ব্যাংকিং তথ্য থেকে জানা গেছে যে, চলতি জুলাই মাসের প্রথম ২৬ দিনেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা সব মিলিয়ে মোট ২৪৪ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে পাঠিয়েছেন। বিগত বছরগুলোর তুলনায় এই অর্জিত অঙ্কটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে এটি এক বিরাট ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা।
পরিসংখ্যানের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, চলতি মাসের এই ২৬ দিনে অর্জিত ২৪৪ কোটি ডলার গত বছরের জুলাই মাসের একই সময়ের তুলনায় অবিশ্বাস্য রকম বেশি। পূর্বের বছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায় যে, এ বছর প্রবাসী আয় বেড়েছে প্রায় ৫০ কোটি ডলার বা শতকরা হিসেবে প্রায় ২৬ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ বেশি। বিদেশের মাটিতে কঠোর পরিশ্রম করা কোটি কোটি প্রবাসী শ্রমিকের এই অদম্য অবদান এবং ঘামে ভেজা অর্থ যখন হুন্ডি বা অবৈধ পথ বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশের মাটিতে প্রবেশ করছে, তখন তা পুরো জাতীয় অর্থনীতিকে এক দারুণ চাঙ্গা ভাব উপহার দিচ্ছে। বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরজুড়েও প্রবাসীদের এই আয়ের পারফরম্যান্স ছিল অত্যন্ত ঈর্ষণীয়। ওই পুরো অর্থবছরে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সর্বমোট ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার বা তার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশে পাঠিয়েছিলেন, যা তার আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫২৬ কোটি ডলার বা ১৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি ছিল। এরও আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির হার ছিল আরও বেশি, যেখানে এককভাবে রেমিট্যান্স বেড়েছিল প্রায় ৬৪২ কোটি ডলার বা ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্য প্রধান উৎসগুলোতে যখন কিছুটা স্থবিরতা বা শ্লথ গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে একমাত্র রেমিট্যান্সের এই উচ্চ ও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির কারণেই মূলত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়ন একটি নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক অবস্থানে টিকে থাকতে পেরেছে। দেশের রপ্তানি আয় কিংবা বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত গতি না থাকলেও প্রবাসীদের পাঠানো এই বৈদেশিক মুদ্রার জোয়ার দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। তবে এর পাশাপাশি মুদ্রাবাজারের অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে ডলারের বিনিময় মূল্যে কিছুটা ওঠানামা অব্যাহত রয়েছে। গত এক মাসের ব্যবধানে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার বা কার্ব মার্কেটে মার্কিন ডলারের দর প্রায় এক টাকার মতো বৃদ্ধি পেয়ে গতকাল সোমবার আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রতিটি ডলার ১২৩ টাকা ৮০ পয়সা দরে বেচাকেনা হয়েছে। ডলারের এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে আমদানিকারকদের খরচ কিছুটা বাড়লেও বৈদেশিক মুদ্রার আন্তঃপ্রবাহ বেশি থাকায় সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর বড় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারছে না বলে মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্যভাণ্ডার থেকে আরও জানা যায় যে, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে নানা ধরনের টানাপোড়েন রয়েছে। চলতি অর্থবছরের গত মে মাস পর্যন্ত বিগত ১১ মাসের পুঞ্জীভূত হিসাব অনুযায়ী দেশের আমদানিতে প্রায় ৬ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি সাধিত হয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ চাহিদার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু এর বিপরীতে একই সময়সীমায় দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত অর্থাৎ রপ্তানি আয় সামান্য হলেও প্রায় ২ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। শুধু তাই নয়, চলতি মাসের একেবারে শুরুর দিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দীর্ঘস্থায়ী বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন বা আকুর বিগত মে-জুন মেয়াদের জন্য প্রায় ১৪৮ কোটি ডলারের বিশাল আমদানি বিল পরিশোধ করতে হয়েছে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়ন থেকে এই বিশাল পরিমাণ ডলার পরিশোধ করার পরও গতকাল সোমবার দেশের মোট বা গ্রস রিজার্ভ সন্তোষজনকভাবে দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের অত্যন্ত কঠোর ও বিশ্বমানের হিসাব পদ্ধতি তথা বিপিএম৬ অনুযায়ী হিসাব করলে দেশের নিট রিজার্ভ বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারে।
বৈদেশিক মুদ্রার এই রিজার্ভ পরিস্থিতির দিকে পেছন ফিরে তাকালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পূর্ববর্তী সরকারের নীতিগুলোর এক স্পষ্ট ও নাটকীয় চিত্র ভেসে ওঠে। বিগত ২০২১ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়ে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ম্যাজিক ফিগার অতিক্রম করেছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাণিজ্যের আড়ালে ব্যাপক হারে অর্থ পাচার বেড়ে যাওয়া, ব্যাংকিং খাতের চরম নৈরাজ্য এবং নানা অনিয়মের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংককে রিজার্ভ থেকে প্রচুর পরিমাণ ডলার বিক্রি করতে হয়েছিল। এর ফলে ধারাবাহিকভাবে রিজার্ভ কমতে কমতে বিগত সরকারের পতনের ঠিক আগমুহূর্তে তা বিপজ্জনকভাবে কমে মাত্র ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছিল। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর মনিটরিংয়ের কারণে অর্থ পাচার রোধে জিরো টলারেন্স নীতি এবং হুন্ডির বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযানের ফলে অবৈধ লেনদেন অনেকাংশে কমে গেছে। হুন্ডি ব্যবসা সংকুচিত হওয়ার কারণে প্রবাসীরা এখন অনেক বেশি আস্থার সঙ্গে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে তাদের কষ্টের উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন, যার ফলে রিজার্ভ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে তা আবার ৩১ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল এবং জুনের শেষে তা ৩৩ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিল।
রেমিট্যান্স প্রবাহের এই ঊর্ধ্বমুখী এবং ধারাবাহিক ধারা ভবিষ্যতেও নিরবচ্ছিন্নভাবে ধরে রাখার জন্য সরকারের নীতিনির্ধারক মহল ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে নানামুখী প্রশংসনীয় উদ্যোগ ও প্রণোদনা অব্যাহত রাখা হয়েছে। প্রবাসীদের বৈধ পথে অর্থ প্রেরণে উৎসাহিত করার জন্য নগদ প্রণোদনা প্রদান, ব্যাংকিং সেবার মান আরও দ্রুত ও সহজলভ্য করা এবং প্রবাসীদের বিভিন্ন ধরনের ভোগান্তি দূর করার জন্য নানামুখী যুগোপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দেশের ব্যাংকিং চ্যানেলে হুন্ডি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কঠোরহস্তে দমন করার ফলে সাধারণ প্রবাসীরা এখন খুব সহজেই কোনো ধরনের ঝামেলা ছাড়াই সরাসরি ব্যাংকের মাধ্যমে তাদের পরিবারের কাছে টাকা পাঠাতে পারছেন। দেশের অর্থনীতির এই দুর্দিনে প্রবাসীদের পাঠানো এই রক্তবিন্দুসম রেমিট্যান্স কেবল দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকেই শক্তিশালী করছে না, বরং অভ্যন্তরীণ গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে শুরু করে সামগ্রিক বাণিজ্যিক কার্যক্রমেও এক বিশাল গতি সঞ্চার করছে। দেশের কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসা ও সরকারের সুদূরপ্রসারী নীতিগত সহায়তার হাত ধরে রেমিট্যান্সের এই সোনালী ধারা আগামী দিনগুলোতেও আরও বেশি বেগবান হবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে অসামান্য অবদান রাখবে বলে সচেতন দেশবাসী ও অর্থনীতিবিদরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।