প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সংবেদনশীল এবং দীর্ঘকাল ধরে ভূরাজনৈতিক বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীর বা পিওকে অঞ্চলে অনুষ্ঠিত তথাকথিত আইনসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সহিংসতার এক ভয়ংকর ও নৃশংস অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। অঞ্চলটিতে আয়োজিত নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে সোমবার যে ব্যাপক ও বিস্তৃত সহিংসতার সূত্রপাত হয়েছিল, তা দ্রুত একটি বড় মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। ভোটগ্রহণ চলাকালীন পিওকের প্রভাবশালী ‘জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি’ বা জেএএসি কর্তৃক আয়োজিত পূর্বঘোষিত ‘লং মার্চ’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিক্ষোভকারীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও নির্বিচারে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এই বর্বরোচিত সংঘর্ষ ও পুলিশের গুলিতে প্রাণহানির সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী অন্তত কুড়ি জন বা বিশ জনে এসে ঠেকেছে। এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গোটা অঞ্চলজুড়ে এক ধরনের যুদ্ধাবস্থা ও চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে, যা সাধারণ মানুষের মনে গভীর শোক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনায় আরও বহুসংখ্যক মানুষ গুরুতর জখম হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেকের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, আহতদের মধ্যে অনেকেরই আঘাত এত গভীর যে মৃতের সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে, যা পুরো পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল ও আশঙ্কাজনক করে তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক পোস্টে জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তাদের প্রতিবাদী লং মার্চের বিশাল বহর ইতিমধ্যে উত্তপ্ত রাওয়ালাকোট শহরে গিয়ে পৌঁছেছে। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই দীর্ঘ পদযাত্রায় নির্মমভাবে প্রাণ হারানো অন্তত উনিশ জন হতভাগ্য মানুষের সঠিক পরিচয় ইতিমধ্যে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। এর পাশাপাশি আরও একজনের মাথার খুলিতে সরাসরি বুলেট আঘাত হানার গুরুতর চিহ্ন পাওয়া গেছে, তবে তার তাৎক্ষণিক কোনো পরিচয় বা স্বজনের সন্ধান মেলেনি। গুলিবিদ্ধ ওই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মরদেহ বর্তমানে পালান্দ্রি হাসপাতালের হিমঘরে সংরক্ষিত রয়েছে, যার ফলে সব মিলিয়ে এই মর্মান্তিক সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা সরকারি ও স্থানীয় হিসাব অনুযায়ী অন্তত কুড়ি জনে দাঁড়িয়েছে।
জেএএসির ক্ষুব্ধ নেতাকর্মী ও আন্দোলনকারীদের প্রত্যক্ষ অভিযোগ অনুযায়ী, রাওয়ালাকোট এলাকায় শান্তিপূর্ণভাবে এগিয়ে চলা শত শত বিক্ষোভকারী ও সাধারণ মানুষের ওপর কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই অত্যন্ত নির্বিচারে সরাসরি গুলি চালিয়েছে পাকিস্তানের সশস্ত্র নিরাপত্তা বাহিনী। মূলত সরকারের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের পূর্বনির্ধারিত বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যাওয়ার পরেই হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ জনতা সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে মুজাফফরাবাদের দিকে পদযাত্রা শুরু করেছিলেন। তিন ধাপে বিভক্ত এই অত্যন্ত বিতর্কিত ও প্রহসনমূলক নির্বাচনটি আগামী ১০ আগস্টের মধ্যে সম্পূর্ণ হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের একেবারে প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ শুরুর দিনেই সরকারবিরোধী দীর্ঘস্থায়ী চলমান বিক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং পুরো অঞ্চলের নির্বাচনী আবহ মুহূর্তের মধ্যে উত্তপ্ত ও সহিংস হয়ে ওঠে। ভারতের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে অনুষ্ঠিত এই তথাকথিত নির্বাচনকে কোনো ধরনের বৈধতা দেওয়া হয় না এবং নয়াদিল্লির স্পষ্ট অবস্থান হলো যে, জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর মতো পিওকে এবং গিলগিট-বালতিস্তানও ভারতের অবিচ্ছেদ্য ও সার্বভৌম অংশ। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক প্রতিক্রিয়ায় অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেছে যে, পিওকে অঞ্চলে চলমান এই ব্যাপক অস্থিরতা ও রক্তপাত মূলত ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের ওপর বিগত দীর্ঘ সময় ধরে চলা পাকিস্তানের ‘পদ্ধতিগত শোষণ’ এবং অমানবিক ‘প্রশাসনিক নিপীড়নের’ অনিবার্য ও ক্ষুব্ধ পরিণতি ছাড়া আর কিছু নয়।
নির্বাচনী মাঠের এই রক্তাক্ত সহিংসতার পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও চরম পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার লড়াই এবং ভোট জালিয়াতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি বা পিপিপির পক্ষ থেকে অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ তুলে বলা হয়েছে যে, ক্ষমতাসীন দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ বা পিএমএল-এনের সশস্ত্র কর্মী ও সমর্থকদের সরাসরি গুলিতে তাদের এক তরুণ কর্মী মুখতার ইউনুস অত্যন্ত নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন এবং এই হামলায় আরও অন্তত দুজন গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ডের পর পিপিপির শীর্ষ চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি দেশের নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত ভূমিকা ও নীরবতা নিয়ে অত্যন্ত কড়া ভাষায় প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে জানতে চেয়েছেন যে, দেশের এই চরম সংকটময় মুহূর্তে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ ঠিক কোথায় লুকিয়ে রয়েছে এবং স্বাধীন নির্বাচন কমিশন আসলে কী ভূমিকা পালন করছে? পিপিপি এবং পিএমএল-এন—উভয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলই বিভিন্ন নির্বাচনী আসনে প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারাতে নজিরবিহীন ভোট কারচুপি, কেন্দ্র দখল ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে। এই ত্রিমুখী সংঘর্ষ ও উত্তেজনার কারণে অনেকগুলো ভোটকেন্দ্রে বাধ্য হয়ে সাময়িকভাবে ভোটগ্রহণ স্থগিত রাখতে হয়েছে।
এদিকে সাবেক জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ বা পিটিআই এই ত্রুটিপূর্ণ ও রক্তক্ষয়ী নির্বাচন শুরু থেকেই সম্পূর্ণভাবে বর্জন করার ঘোষণা দিয়েছিল। অন্যদিকে পিওকের আন্দোলনরত সংগঠন জেএএসি-কে সরকার কতৃক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি সংঘাতময় করে তুলেছে। পিটিআইয়ের দাবি অনুযায়ী, গত মাসেই জেএএসি-র নেতৃত্বে পরিচালিত বিক্ষোভ ও আন্দোলনের সময় ঘটা তীব্র সহিংসতায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। ওই গণআন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বিগত প্রায় পঞ্চাশ দিন ধরে পিওকে অঞ্চলের সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যাতায়াত সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত ও অচল হয়ে পড়েছিল। মূলত জেএসি আইনসভায় পরাধীন অঞ্চলের শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত অপ্রয়োজনীয় বারোটি আসন চিরতরে বাতিল করা, অন্যায়ভাবে আটককৃত শত শত রাজনৈতিক কর্মীকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ কর্তাদের দায়ের করা সমস্ত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা এবং সার্বিক প্রশাসনিক সংস্কারের জোরালো দাবি জানিয়ে আসছিল। কিন্তু সরকার তাদের একটি দাবিও মেনে না নিয়ে উল্টো দমনপীড়ন চালানোয় আলোচনা পুরোপুরি ভেঙে যায় এবং জনতা মুজাফফরাবাদের উদ্দেশে এই পদযাত্রা শুরু করতে বাধ্য হয়। উদ্ভূত এই ভয়াবহ সহিংসতার কারণে সুধনোতি ও রাওয়ালাকোট জেলার নির্ধারিত নির্বাচন স্থগিত করে তা আগামী ১০ আগস্ট পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।