যশোরের এমপির বাসভবনে হামলা: মাদ্রাসায় ঢুকে সংঘর্ষ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬
  • ২৯ বার
যশোরের এমপির বাসভবনে হামলা: মাদ্রাসায় ঢুকে সংঘর্ষ

প্রকাশ: ২৮ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজনীতি এবং জনপ্রতিনিধিদের নৈতিক দায়িত্ববোধ নিয়ে সারা দেশে যখন নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে, ঠিক তখনই সাধারণ মানুষের সঙ্গে ক্ষমতার এক মারাত্মক সংঘাতের চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জেলা যশোরে। রাস্তাঘাট ব্যবহার ও যাতায়াতকে কেন্দ্র করে স্থানীয় একটি মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের সঙ্গে অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক এক বিরোধে জড়িয়ে পড়েন যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) আসন থেকে সম্প্রতি নির্বাচিত জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গোলাম রসুল ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে সরাসরি মাদ্রাসার ভেতর ঢুকে শিক্ষক ও অভিভাবকদের ওপর চড়াও হওয়ার অভিযোগ ওঠে এমপির মেয়ের বিরুদ্ধে, যার ফলে মুহূর্তের মধ্যে ফুসে ওঠে স্থানীয় এলাকাবাসী। এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আজ মঙ্গলবার বেলা এগারোটার দিকে যশোর শহরের নীলগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত সংসদ সদস্য গোলাম রসুলের ব্যক্তিগত বাসভবনে বিক্ষুব্ধ জনতা আকস্মিক হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও তণ্ডব চালায়। এই নজিরবিহীন ঘটনায় পুরো শহরজুড়ে তীব্র উত্তেজনা ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে স্থানীয় বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শী এবং পুলিশ সূত্রে জানা গেছে যে, সংসদ সদস্য গোলাম রসুলের শহরের নীলগঞ্জ এলাকার নিজ বাসভবনের ঠিক সামনেই অবস্থিত অত্যন্ত পরিচিত ‘আল মাদ্রাসাতুশ শারইয়াহ’ ও সংলগ্ন একটি মসজিদ। বহুদিন ধরেই ওই মাদ্রাসার কোমলমতি শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং স্থানীয় মুসল্লিদের নিয়মিত যাতায়াতের প্রধান রাস্তাটি নিয়ে এমপির পরিবারের সঙ্গে এক ধরনের চাপা অসন্তোষ ও বিরোধ চলে আসছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ ও সূত্রমতে, ওই যাতায়াতের রাস্তাটি নিয়ে আইনি ও সামাজিক জটিলতার সৃষ্টি করে মাদ্রাসাটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার বা শিক্ষার্থীদের চলাচলে বাধা দেওয়ার পাঁয়তারা করা হচ্ছিল, যা এলাকাবাসীর মনে গভীর ক্ষোভের বীজ বপন করেছিল। এর ঠিক আগের দিন অর্থাৎ সোমবার সংসদ সদস্যের কন্যা অনন্যা মাদ্রাসার কয়েকজন নিরীহ শিক্ষার্থীকে ডেকে বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করেন। শিশুদের ভয় দেখানোর ওই অপ্রীতিকর ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং সেদিন তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের জোরালো মধ্যস্থতায় কোনোমতে বিষয়টি সাময়িকভাবে মীমাংসা করা হয়েছিল।

কিন্তু সেই পূর্ববিরোধের রেশ পুরোপুরি কেটে যাওয়ার আগেই মঙ্গলবার সকালে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ভাষ্য অনুযায়ী, সংসদ সদস্য গোলাম রসুল ও তাঁর মেয়ে অনন্যা সশরীরে দলবল নিয়ে সরাসরি ওই মাদ্রাসার ভেতরে প্রবেশ করেন এবং শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে অত্যন্ত উগ্র ও আক্রমণাত্মক আচরণ করে নতুন করে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠলে একপর্যায়ে এমপির মেয়ে অনন্যা স্থানীয় রেক্সনা নামের এক নারীর ওপর চড়াও হন এবং সজোরে আঘাত করে তাঁর মাথা ফাটিয়ে রক্তাক্ত করে দেন। এখানেই থেমে থাকেননি তিনি, বরং পরবর্তীতে নাসির উদ্দিন নামের অপর এক অভিভাবক প্রতিবাদ করতে গেলে তাঁর ওপরও শারীরিক ও মানসিকভাবে চড়াও হন তিনি। মাদ্রাসার পবিত্র প্রাঙ্গণে একজন সম্মানিত জনপ্রতিনিধির পরিবারের এমন বর্বরোচিত ও আক্রমণাত্মক আচরণ দেখে উপস্থিত সাধারণ শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং এলাকাবাসী চরমভাবে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক ও বেগতিক বুঝতে পেরে সংসদ সদস্য এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা দ্রুত নিজেদের বাসভবনের ভেতরে প্রবেশ করে মূল ফটক ভেতর থেকে শক্ত করে বন্ধ করে দেন এবং নিজেদের অবরুদ্ধ করে রাখেন।

মাদ্রাসার ভেতরে নারী ও অভিভাবকদের ওপর হামলার খবর মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে নীলগঞ্জ এলাকাসহ আশপাশের হাজার হাজার সাধারণ মানুষ লাঠিসোঁটা ও বিক্ষোভের স্লোগান নিয়ে এমপির বাসভবনের সামনে এসে জড়ো হন। বিক্ষুব্ধ জনতা ওই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং এমপির ক্ষমতার অপব্যবহারকারী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে ক্ষোভে ফেটে পড়া এলাকাবাসী সংসদ সদস্য গোলাম রসুলের বাসভবনের প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং নিচতলার বিভিন্ন আসবাবপত্র, জানালা ও সম্পত্তির ওপর ব্যাপক ভাঙচুর চালান। জামায়াতের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য এবং জেলা জামায়াতের আমিরের মতো একজন শীর্ষ নেতার বাড়িতে এমন জনরোষের মুখে পড়ার ঘটনা এলাকায় চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে তীব্র অভিযোগ তোলা হয় যে, ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মসজিদ বন্ধ করার চক্রান্ত চলছে এবং সাধারণ মানুষের চলাচলের রাস্তা বন্ধ করার মাধ্যমে চরম অন্যায় করা হচ্ছে।

পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হলে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায় যশোর কোতোয়ালি থানা পুলিশের একটি বিশাল ও সশস্ত্র দল। পুলিশ সদস্যরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং বিক্ষুব্ধ জনতার সঙ্গে কথা বলে এমপির বাসভবনের চারপাশ ঘিরে ফেলে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেন। যশোর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি মাসুম খান সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, গতকাল বাড়ির সামনের মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংসদ সদস্যের মেয়ের যে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় আজ সকালে এলাকাবাসীর সঙ্গে এমপির পরিবারের নতুন করে ঝামেলা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এর জেরে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী বিচার ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ওই বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালান। বর্তমানে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন এবং অবরুদ্ধ সংসদ সদস্য ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।

এদিকে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়ে সংসদ সদস্য গোলাম রসুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি লাইভ ভিডিওতে যুক্ত হন এবং নিজের অসহায়ত্বের কথা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন। ফেসবুক লাইভে এসে তিনি অত্যন্ত বিনীত সুরে বলেন যে, মাদ্রাসায় যাতায়াতের যে রাস্তাটি নিয়ে এত বিরোধ, সেটি আসলে তাদের নিজস্ব টাকা দিয়ে কেনা ব্যক্তিগত সম্পত্তি, তবে সেই রাস্তাটি সবসময় সচল রাখতে হবে জেনেই তারা কাজ করছেন। রাস্তাটি নিয়ে এর আগেও তাঁর মেয়ের সঙ্গে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও স্থানীয় হুজুরদের অনভিপ্রেত কথা–কাটাকাটি হয়েছিল। উদ্ভূত এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য তিনি সম্পূর্ণভাবে মর্মাহত এবং দেশবাসীর কাছে এই ভুলের জন্য করজোড়ে ক্ষমাপ্রার্থী বলে জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, তাঁরা এলাকার সবার সঙ্গে মিলেমিশে শান্তিতে বসবাস করতে চান এবং এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাত তাঁরা কখনোই চাননি।

তবে নিজের মেয়ের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও সংবেদনশীল দাবি করে এমপি গোলাম রসুল বলেন যে, তাঁর মেয়ে অনন্যা দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মক মানসিক সমস্যায় ভুগছেন এবং একজন মানসিক রোগী। মেয়ের উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ভারতের হায়দরাবাদসহ দেশের বিভিন্ন খ্যাতিমান হাসপাতালে নিয়ে দীর্ঘ চিকিৎসা করানো হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। চরম নিরাপত্তাহীনতার কথা উল্লেখ করে তিনি লাইভে আরও বলেন, ‘আমি অত্যন্ত ভীতসন্ত্রস্ত এবং গভীর নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। কেউ যেন আমার বাড়িতে গান পাউডার এনে রেখে দিয়েছে, আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে কোনো মুহূর্তে আমার এই বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হতে পারে।’ একজন জাতীয় সংসদ সদস্য হয়ে নিজের বাসভবনে এভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার এই মর্মান্তিক পরিণতি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে যে, সংসদ সদস্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে কী বলেছেন বা কোন আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেছেন, তা একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়, তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং যেকোনো ধরনের বড় ধরনের সহিংসতা এড়াতে পুলিশ সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত