চারবারের চেষ্টায় পুলিশ ক্যাডারে জাবেদ, বাবাকে হারানোর কষ্টও

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৯ বার

প্রকাশ: ৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

স্বপ্ন পূরণের পথ সব সময় সরল হয় না। কখনো কখনো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘ সময়, পাড়ি দিতে হয় একাধিক ব্যর্থতার ধাপ। এমনই এক অধ্যবসায় ও ধৈর্যের গল্প মো. জাবেদ হোসেনের। চারবারের চেষ্টার পর অবশেষে নিজের পছন্দের ক্যাডারেই জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এই তরুণ।

জাবেদ হোসেনের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতি, একাধিকবার হতাশা, আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিক শক্তি। ২০২১ সালের শেষ দিকে বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালের শুরু থেকে মূল প্রস্তুতিতে পুরোপুরি মনোযোগ দেন। তবে পথটি সহজ ছিল না। প্রথম কয়েকটি পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল না পেলেও নিজের লক্ষ্য থেকে সরে যাননি তিনি।

৪৪তম বিসিএসে প্রথমবার অংশ নিয়ে প্রিলিমিনারি পরীক্ষাতেই উত্তীর্ণ হতে পারেননি জাবেদ। সেই ব্যর্থতা তাঁকে থামিয়ে দেয়নি। বরং ভুলগুলো খুঁজে বের করে নতুন পরিকল্পনায় এগিয়ে যান তিনি। ৪৫তম বিসিএসে নন-ক্যাডার হিসেবে ইনস্ট্রাক্টর পদে সুপারিশ পেয়েছিলেন। এরপর ৪৬তম বিসিএসে প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভাইভাতেও অংশ নেন। তবে চূড়ান্ত ফলাফলে জায়গা হয়নি তাঁর।

পরপর কয়েকটি অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ৪৭তম বিসিএসে আবারও লড়াইয়ে নামেন জাবেদ। এবার সফলতা ধরা দেয়। তাঁর ক্যাডার পছন্দক্রম ছিল প্রশাসন, পুলিশ, কাস্টমস, ট্যাক্স ও অডিট। শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় পছন্দের পুলিশ ক্যাডারেই নিজের কাঙ্ক্ষিত জায়গা অর্জন করেন তিনি।

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করা জাবেদ হোসেন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও ভালো ফলাফল করেছেন। তিনি স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ৩ দশমিক ৮৭ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা করলেও তাঁর আগ্রহ ছিল প্রশাসনিক ও জনসেবামূলক পেশার দিকে। সেই আগ্রহ থেকেই বিসিএসকে নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেন।

নিজের প্রস্তুতির ধরন সম্পর্কে জাবেদ হোসেন বলেন, বিসিএস প্রস্তুতির শুরুতেই তিনি আগের বছরের প্রশ্নপত্র ও পরীক্ষার সিলেবাস বিশ্লেষণ করেন। কোন বিষয়ে তাঁর দক্ষতা বেশি এবং কোন বিষয়ে আরও উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে, তা চিহ্নিত করে পরিকল্পনা তৈরি করেন। এরপর বিষয়ভিত্তিক লক্ষ্য নির্ধারণ করে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যান।

তিনি জানান, প্রস্তুতির সময় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট অংশ শেষ করার লক্ষ্য রাখতেন। যেমন বাংলা সাহিত্যের কোনো একটি যুগ শেষ করার পাশাপাশি গণিতের একটি অধ্যায় সম্পন্ন করা কিংবা ইংরেজির নির্দিষ্ট পরিমাণ শব্দভান্ডার আয়ত্ত করা। এভাবে ছোট ছোট লক্ষ্য পূরণের মাধ্যমে বড় প্রস্তুতিকে এগিয়ে নিয়েছেন তিনি।

লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতিকে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং মনে করেন জাবেদ। তাঁর মতে, লিখিত পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, সাজানো এবং নিজের মতো করে নোট তৈরি করা ছিল কঠিন কাজগুলোর একটি। তবে সময়ের সঙ্গে সেই অভ্যাস তৈরি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলাদা করে চিহ্নিত করে বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি।

জাবেদের এই সাফল্যের গল্পে আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে কিছু ব্যক্তিগত কষ্টও। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বাবাকে হারানোর বেদনা তাঁকে বহন করতে হয়েছে। বিসিএসের কঠিন প্রস্তুতির সময় পরিবারের এই শূন্যতা তাঁর জন্য বড় এক মানসিক পরীক্ষা ছিল। তবে পরিবারের সমর্থন ও নিজের দৃঢ় মনোবল তাঁকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।

জাবেদ মনে করেন, বিসিএসের মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় শুধু মেধা নয়, ধৈর্য ও ধারাবাহিকতাও গুরুত্বপূর্ণ। বারবার ব্যর্থতার পরও যারা চেষ্টা চালিয়ে যান, তাঁদের জন্য সফলতার সুযোগ থাকে।

নতুন বিসিএস প্রার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, হতাশ না হয়ে নিজের লক্ষ্য ঠিক রাখতে হবে। আত্মবিশ্বাস ধরে রেখে পরিকল্পিতভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। তবে একই সঙ্গে ক্যারিয়ারের বিকল্প পথও খোলা রাখা প্রয়োজন। কোনো কারণে বিসিএসে সফলতা না এলে উচ্চশিক্ষা, ব্যবসা কিংবা অন্য চাকরির সুযোগ নিয়েও ভাবা উচিত।

বই নির্বাচনের ক্ষেত্রেও জাবেদের পরামর্শ হলো, একই বিষয়ের জন্য একাধিক বই সংগ্রহ করে বিভ্রান্ত না হয়ে নির্দিষ্ট কয়েকটি ভালো বই অনুসরণ করা। তাঁর মতে, প্রিলিমিনারির জন্য একটি নির্ভরযোগ্য বই এবং লিখিত পরীক্ষার জন্য সর্বোচ্চ দুটি বই যথেষ্ট হতে পারে। পাশাপাশি নিয়মিত সংবাদপত্র পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

জাবেদের মতে, বিসিএস প্রস্তুতি শুধু একটি পরীক্ষার প্রস্তুতি নয়, এটি নিজের জ্ঞান, বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও মানসিক শক্তি বৃদ্ধির একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এই পথে ধৈর্য হারালে চলবে না।

চারবারের প্রচেষ্টা, একাধিকবার হতাশা এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে জাবেদ হোসেনের এই সাফল্য নতুন বিসিএস প্রত্যাশীদের জন্য অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে থাকবে। তাঁর যাত্রা দেখিয়ে দেয়, নির্দিষ্ট লক্ষ্য, সঠিক পরিকল্পনা এবং অবিচল প্রচেষ্টা থাকলে দীর্ঘ অপেক্ষার পরও কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন পূরণ সম্ভব।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত