গ্যাস সরবরাহ সামান্য বাড়লেও কাটেনি সংকট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৯ বার
গ্যাস সরবরাহ সামান্য বাড়লেও কাটেনি সংকট
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের জ্বালানি খাতে চলমান তীব্র অস্বস্তি ও সংকটের প্রেক্ষাপটে কিছুটা স্বস্তির বাতাস বয়ে যাওয়ার চেষ্টা হলেও সার্বিক পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে এখনও বেশ কিছুটা সময় লাগবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কক্সবাজারের মহেশখালীর উপকূলবর্তী এলাকায় অবস্থিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি টার্মিনালের একটি বয়লার অবশেষে চালু করা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা নজিরবিহীন ও তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে দেশের শিল্পকারখানা, আবাসিক এলাকা এবং সিএনজি চালিত যানবাহনের চালকদের মাঝে যে হাহাকার ও চরম দুর্ভোগ তৈরি হয়েছিল, তা থেকে সাময়িক একটু মুক্তির আভাস পাওয়া গেছে। তবে গ্যাস সরবরাহের এই সামান্য বৃদ্ধি সত্ত্বেও দেশের শিল্পাঞ্চলগুলো, গৃহস্থালি রান্নার চুলা এবং বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের কাঙ্ক্ষিত চাপ বা প্রেশার এখনও ফিরে আসেনি। গ্যাসের এই দীর্ঘমেয়াদি ও তীব্র সংকটের নেতিবাচক প্রভাব এতটাই মারাত্মক আকার ধারণ করেছে যে, এর সরাসরি জেরে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের অন্যতম বৃহৎ ও শীর্ষস্থানীয় পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের দীর্ঘ ৯টি বড় আকারের কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে কতৃপক্ষ।
জ্বালানি ও বিদ্যুতের এই চরম সংকটের কারণে দেশের সাধারণ মানুষের জনজীবন যখন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে, ঠিক তখনই এর প্রতিবাদে ও দ্রুত সমাধানের দাবিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন সোচ্চার হয়ে উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোটের পক্ষ থেকে জ্বালানি খাতের এই শোচনীয় অবস্থার স্থায়ী সমাধানের জোরালো দাবিতে সচিবালয় ঘেরাও করার মতো একটি কঠোর কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। শুধু রাজধানী ঢাকাতেই নয়, বরং দেশের বিভিন্ন জেলা ও জনপদে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে মানববন্ধন, বিক্ষোভ প্রদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা অব্যাহত রয়েছে। জ্বালানির মতো একটি মৌলিক ও জীবনযাত্রার অত্যাবশ্যকীয় উপাদানের এই সংকট দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনকে একধরনের স্থবিরতার মুখে ঠেলে দিয়েছে, যা থেকে দ্রুত উত্তরণের জন্য সর্বস্তরের মানুষ এখন সরকারের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় দেশের সার্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা আরও সুদৃঢ় ও টেকসই করার একটি অংশ হিসেবে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমান জ্বালানি সংকটের স্থায়ী ও বিকল্প মোকাবিলার অংশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান পাইপলাইনের মাধ্যমে বর্তমানের তুলনায় আরও বেশি পরিমাণে ডিজেল সরবরাহের জন্য বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। সচিবালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার পর জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এই বিশেষ অনুরোধের কথা সাংবাদিকদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানান। বৈঠকে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে খোলামেলা ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। বর্তমান সংকটের দিনে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের বহুমুখী উৎস নিশ্চিত করার এই উদ্যোগকে অত্যন্ত দূরদর্শী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, গত বৃহস্পতিবার ভোর তিনটা দশ মিনিটে মহেশখালীর দুর্ঘটনাজনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে পুনরায় গ্যাস সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে এই সচল অংশটি থেকে দৈনিক প্রায় আটাশ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় সঞ্চালন লাইনে যুক্ত হচ্ছে। খুব শীঘ্রই যখন এই টার্মিনালের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় বয়লারটি পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হবে, তখন জাতীয় গ্রিডে আরও অতিরিক্ত প্রায় ত্রিশ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটি অর্জিত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো, ভারী ও মাঝারি শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশন এবং আবাসিক গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ অর্থাৎ গ্যাসের কম চাপের সমস্যা চিরতরে দূর হয়ে যাবে বলে পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন যে, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল হওয়ার পর দেশে গ্যাস সরবরাহে আর কোনো বড় ধরনের ঘাটতি থাকবে না এবং ইতোমধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ এলএনজি কার্গোর সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে দৈনিক প্রাকৃতিক গ্যাসের মোট চাহিদা রয়েছে প্রায় তিন শ আশি কোটি ঘনফুট। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, গত ২১ জুলাই মহেশখালীর ওই টার্মিনালে হঠাৎ করে ভয়াবহ আগুন লাগার পর সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে শুরু করে। দুর্ঘটনার ঠিক আগে যেখানে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন নিয়মিতভাবে দুই শ পঁয়ষট্টি কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো, তা হরাস পেয়ে মাত্র দুই শ বারো কোটি ঘনফুটে এসে ঠেকেছিল। বর্তমানের এই সামান্য উন্নতির ফলে সরবরাহের পরিমাণ বেড়ে দৈনিক প্রায় দুই শ চল্লিশ কোটি ঘনফুটে উন্নীত হয়েছে। তবে দেশের বিশাল চাহিদার তুলনায় এই বর্তমান উৎপাদন ও সরবরাহ এখনো অনেক বেশি কম হওয়ায় অধিকাংশ আবাসিক এলাকা এবং শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক গ্যাসের চাপ ফিরে আসার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। গ্যাসের এই ব্যাপক ঘাটতির কারণে দেশজুড়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ভয়াবহভাবে হ্রাস পেয়েছিল, যার ফলে গত কয়েক দিন ধরে সাধারণ গ্রাহকদের অসহনীয় লোডশেডিংয়ের কবলে পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে গত সোমবার বিদ্যুতের সামগ্রিক ঘাটতি বা লোডশেডিংয়ের পরিমাণ সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের রেকর্ড সীমা অতিক্রম করেছিল। তবে বৃহস্পতিবার গ্যাস সরবরাহ সামান্য বৃদ্ধি পাওয়া এবং আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে কিছুটা অনুকূলে থাকায় পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি ঘটলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অজস্র এলাকায় এখনো নিয়মিত লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায় মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে রয়েছে।
দেশের সার্বিক এই জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকেও নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ গতকাল সচিবালয়ে কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অত্যন্ত জোরালোভাবে আশা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি সম্পূর্ণভাবে মেরামত শেষে চালু করা সম্ভব হবে। তিনি বিশ্বাস করেন যে, সেই কাঙ্ক্ষিত সময়সীমার মধ্যে দেশের সামগ্রিক গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি সুচারুভাবে পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাবে এবং সাময়িকভাবে বন্ধ থাকা দেশের সকল গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো পুনরায় পূর্ণোদ্যমে চালু করা যাবে। মন্ত্রী মহোদয় আরও উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমানের এই আকস্মিক সংকট মূলত একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ও যান্ত্রিক ত্রুটির ফল মাত্র এবং সরকার কোনো রকম কালক্ষেপণ না করে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার জন্য দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে।
তবে সরকারি আশ্বাসের বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত দেশের উৎপাদনমুখী শিল্পখাত যে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে, তার এক জ্বলন্ত প্রমাণ দেখা গেছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। গ্যাস সংকটের তীব্র ও নেতিবাচক প্রভাবের কারণে চট্টগ্রাম ইপিজেডের অভ্যন্তরে অবস্থিত দেশের অন্যতম প্রধান ও শীর্ষস্থানীয় পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের টানা নয়টি বড় কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বশীল পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখার জন্য যে পরিমাণ নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের চাপ প্রয়োজন, তা না পাওয়ার কারণে উৎপাদনে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। রপ্তানিমুখী এই পোশাক কারখানাগুলো হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে এবং হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান সাময়িকভাবে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। চট্টগ্রাম ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মহিউদ্দিন বিন মেজবাহ এই প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, সাম্প্রতিক সময়ের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট কারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রমে ব্যাপক ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। তবে খুব শীঘ্রই যেন ইপিজেডের সকল কারখানায় সমানভাবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিকভাবে নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত