প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সংলাপে নতুন গতি সঞ্চার হয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক এবং জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে এনসিপির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুকের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ বৈঠক করেছেন। বৃহস্পতিবার ঢাকার গুলশানে অবস্থিত ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সরকারি বাসভবনে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ ও গঠনমূলক পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা এবং ভবিষ্যতের কর্মপন্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
বৈঠকে এনসিপির প্রতিনিধি দলে উপস্থিত ছিলেন দলের মুখপাত্র এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম পরিচিত মুখ আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, দলের যুগ্ম সদস্যসচিব ও গ্লোবাল ডায়াস্পোরা সেলের প্রধান আলাউদ্দীন মোহাম্মদ এবং এনসিপির পেশাজীবী সংগঠন ন্যাশনাল প্রফেশনালস অ্যালায়েন্সের বা এনপিএ-এর আহ্বায়ক নাভিদ নওরোজ শাহ। বৈঠকে অংশ নেওয়া এনসিপির দায়িত্বশীল নেতারা জানিয়েছেন যে, বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি জবাবদিহিমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে আন্তর্জাতিক অংশীদার হিসেবে যুক্তরাজ্যের সহযোগিতা ও গঠনমূলক সম্পৃক্ততা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সঙ্গে এই বৈঠক কেবল সৌজন্যমূলক ছিল না, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কার ও জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নে এনসিপির সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলনও ছিল।

আলোচনার মূল কেন্দ্রে ছিল বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের রোডম্যাপ। নাহিদ ইসলাম ব্রিটিশ হাইকমিশনারকে অবহিত করেন যে, জাতীয় নাগরিক পার্টি এমন একটি শাসনকাঠামো চায় যেখানে প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান হবে স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক। তিনি বৈঠকে স্পষ্ট করেন যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের শোষণের শৃঙ্খল ভেঙে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে এবং ভবিষ্যতে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে এনসিপি অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতিটি খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের প্রধান দাবি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক বিবর্তনের প্রতি বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বৈঠকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় যুক্তরাজ্যের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। বিশেষ করে মানবাধিকার সুরক্ষা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং একটি অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির বিষয়ে আলোচনা করেন উভয় পক্ষ। বৈঠকে এনসিপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, বিশ্বায়নের এই যুগে একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা এবং তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে যে কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে, তা ভবিষ্যতে আরও সুদৃঢ় হবে বলে উভয় পক্ষ আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।
এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব আলাউদ্দীন মোহাম্মদ বৈঠকের পর জানান যে, এই ধরণের কূটনৈতিক আলোচনা দেশ ও জাতির স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি বলেন, আমরা যখন একটি নতুন রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে কাজ করছি, তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের অবস্থানের যৌক্তিকতা ও স্বচ্ছতা তুলে ধরা জরুরি। গ্লোবাল ডায়াস্পোরা সেলের প্রধান হিসেবে তিনি যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করার বিষয়েও ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সঙ্গে কথা বলেছেন। প্রবাসীরা কীভাবে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারেন, তা নিয়ে উভয় পক্ষের আলোচনার বিষয়টি বেশ ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
পাশাপাশি পেশাজীবীদের সংগঠন ন্যাশনাল প্রফেশনালস অ্যালায়েন্সের আহ্বায়ক নাভিদ নওরোজ শাহ দেশের মেধাবী ও দক্ষ পেশাজীবীদের রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন। দেশের তরুণ প্রজন্ম এবং পেশাজীবীরা যেভাবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর কেড়েছে। ব্রিটিশ হাইকমিশনার এ সময় তরুণদের এই অংশগ্রহণকে সাধুবাদ জানান এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য সব অংশীজনকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গঠনে পেশাজীবীদের অবদান ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ব্রিটিশ প্রতিনিধি দল বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, যা বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা।

সবশেষে, নাহিদ ইসলাম ব্রিটিশ হাইকমিশনারের বাসভবনে আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানান এবং আগামী দিনগুলোতে পারস্পরিক সম্পর্ক আরও গভীর করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশের এই কঠিন সময়ে আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন ও পর্যবেক্ষণ আমাদের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আমাদের নিজস্ব রাজনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে সঠিক পথে পরিচালনা করাও আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই বৈঠকে নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দল যে পরিপক্বতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন, তা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। একটি আধুনিক ও কল্যাণকামী বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এনসিপির এই কূটনৈতিক তৎপরতা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে আরও জোরদার হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।