সিলেটে দুই বাসের সংঘর্ষে ঝরল ৮ প্রাণ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩০ বার
সিলেটে দুই বাসের সংঘর্ষে ঝরল ৮ প্রাণ
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিলেটের আকাশ তখনো ভোরের স্নিগ্ধতায় ঢাকা, প্রকৃতি তার শান্ত রূপ নিয়ে ঘুম ভেঙে জেগে উঠছিল মাত্র। শুক্রবার সকালের সেই শান্ত পরিবেশকে মুহূর্তের মধ্যে এক বীভৎস আর্তনাদে স্তব্ধ করে দিয়েছে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার কাশিকাপন নামক স্থানে দুটি দ্রুতগামী যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে আটজন নিরীহ যাত্রী প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে কোমলমতি শিশুও রয়েছে, যাদের অকাল প্রস্থান পুরো এলাকাকে শোকে মূহ্যমান করে তুলেছে। শুক্রবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা ইউনিক পরিবহনের একটি বাস এবং সিলেট থেকে ছেড়ে যাওয়া বেঙ্গল স্লিপার পরিবহনের অপর একটি বাসের মধ্যকার এই ভয়ংকর সংঘর্ষটি ঘটে। সংঘর্ষের তীব্রতা এতটাই প্রকট ছিল যে বাস দুটির সম্মুখভাগ দুমড়েমুচড়ে গিয়ে এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
ঘটনার পরপরই এলাকাটি যেন এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। মহাসড়কের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মানুষের আর্তনাদ, আহাজারি আর বাসের ভাঙা টুকরোর স্তূপ এক ভয়াবহ পরিস্থিতির জানান দিচ্ছিল। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সকালের কুয়াশা কাটতে না কাটতেই বাসের বিকট শব্দ এবং এরপরই মানুষের কান্নার আওয়াজ তাদের ঘরের বাইরে টেনে নিয়ে আসে। তারা দ্রুত ছুটে গিয়ে দেখেন, মহাসড়কের ওপর বাস দুটি একে অপরের ওপর আছড়ে পড়ে আছে। তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয়রা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পরবর্তীতে পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের বেশ কয়েকটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযানকে ত্বরান্বিত করে। তবে ঘটনাস্থল থেকে যারা উদ্ধার হয়েছেন, তাদের অধিকাংশের অবস্থা ছিল আশঙ্কাজনক।
সিলেটের ওসমানীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. গোলাম মোস্তফা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ঘটনাস্থল থেকে শিশুসহ আটটি মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। তবে হতাহতদের পরিচয় এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ প্রশাসন নিহতদের নাম-পরিচয় শনাক্ত করার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। হাসপাতালে ভর্তি থাকা আহতদের অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর থেকেই আত্মীয়-স্বজনরা হাসপাতালগুলোতে ভিড় করছেন, কিন্তু অধিকাংশ নিহতের চেহারা বিকৃত হয়ে যাওয়ায় তাদের শনাক্ত করা স্বজনদের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, দুই বাসের চালকের বেপরোয়া গতি এবং মহাসড়কে ওভারটেক করার প্রবণতাই এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার মূল কারণ। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এমনিতেই দীর্ঘ এবং অনেক জায়গায় এর প্রশস্ততা কম, যার ফলে বড় ধরনের বাহন চালানোর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন। কিন্তু পরিবহন চালকদের এই অতিউৎসাহ এবং প্রতিযোগিতামূলক ড্রাইভিং যে কতগুলো পরিবারকে নিমিষেই নিঃস্ব করে দিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই মহাসড়কে এর আগেও একাধিকবার এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা সড়ক পরিবহন খাতের চরম অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার দিকেই ইঙ্গিত করে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, মহাসড়কগুলোতে নিয়মিত মনিটরিং এবং আইন প্রয়োগে শৈথিল্য থাকার কারণেই পরিবহন চালকরা এভাবে নিয়ম ভাঙার সাহস পাচ্ছেন।
দুর্ঘটনার পর মহাসড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়, যা কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী ছিল। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে তারা কঠোর পরিশ্রম করছেন এবং মহাসড়কে যান চলাচল পুনরায় সচল করার চেষ্টা চলছে। তবে দুর্ঘটনা কবলিত বাস দুটি রাস্তা থেকে সরিয়ে নেওয়া না পর্যন্ত যান চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার গতি ছিল মন্থর। এই ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে। অনেক সচেতন নাগরিক প্রশ্ন তুলেছেন, এভাবে আর কত প্রাণ দিলে মহাসড়কের এই রক্তপাত থামবে।
নিহতদের স্বজনদের আহাজারি এখন ওসমানীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বাতাসকে ভারি করে তুলেছে। মায়ের কোলে শিশু, বাবার পাশে সন্তান—সবই যেন এক নিমিষে হারিয়ে গেল। যাদের কেউ হয়তো জীবনের প্রয়োজনে ঢাকায় ফিরছিলেন, কেউবা আবার সিলেটে আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার পথে এমন অকাল পরিণতির শিকার হলেন। বেঁচে থাকা আহতদের আর্তনাদ যেন আরও বেশি বেদনাদায়ক। তাদের অনেকেরই শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ। কেউ হাত হারিয়েছেন, কেউ পা, আবার কারো মস্তিষ্কে আঘাত লেগেছে গুরুতরভাবে। চিকিৎসকরা তাদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু এই দুর্ঘটনা তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে যে ক্ষতি করেছে, তা কোনোভাবেই পূরণীয় নয়।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর পরিবহন খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং মহাসড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি আবারও জোরালো হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন সময় সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হলেও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান মিলছে না। চালকদের প্রশিক্ষণের অভাব, দীর্ঘ সময় একটানা গাড়ি চালানো, ফিটনেসবিহীন গাড়ি এবং ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা—সবকিছু মিলে মহাসড়ক এখন এক আতঙ্কের নাম। সরকারের পক্ষ থেকে হয়তো তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে, রিপোর্টও জমা দেওয়া হবে, কিন্তু সেই রিপোর্টের আলোকে কোনো স্থায়ী পরিবর্তন বা আইন প্রয়োগ না হলে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা অনিশ্চিতই থেকে যাবে। শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর কান্না থামানোর জন্য কেবল ক্ষতিপূরণ যথেষ্ট নয়, বরং ভবিষ্যতে যেন আর কোনো পরিবারকে এমন নির্মমতার মুখোমুখি হতে না হয়, তার জন্য এখনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সিলেটের এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, আমাদের দেশের সড়ক ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর এবং চালকদের দায়িত্ববোধ কতটুকু অভাব। আইনের শাসনের অভাব থাকলে পরিবহন খাতের নৈরাজ্য কোনোভাবেই থামানো সম্ভব নয়। সরকারি উদ্যোগে চালকদের লাইসেন্স পরীক্ষা, বাসের ফিটনেস যাচাই এবং মহাসড়কে গতিসীমা নিশ্চিত করতে স্পিড গান বা ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। আমরা আশা করি, ওসমানীনগরের এই ঘটনায় যে বা যারা দায়ী, তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে সরকারিভাবে পর্যাপ্ত সহযোগিতা প্রদান করা হবে। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার শোক যেন আমাদের সবাইকে সচেতন হওয়ার নতুন প্রেরণা দেয়। সড়ক যেন আর কারো শেষ গন্তব্য না হয়, এই প্রত্যাশাই রইল আজকের এই শোকাবহ দিনে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত