প্রকাশ: ৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের স্বর্ণ ব্যবসাকে একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে আনতে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরে অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়ে আসা এই খাতকে বৈধ ব্যবসায়িক কাঠামোর আওতায় এনে রাজস্ব আদায়, চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ এবং রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়ানোর লক্ষ্যেই ‘স্বর্ণ নীতিমালা ২০১৮ (সংশোধিত) ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করা হয়েছে।
খসড়া নীতিমালার ওপর সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও স্বর্ণ খাতের অংশীজনদের মতামত চেয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। আগামী রোববারের মধ্যে লিখিত মতামত জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সংশ্লিষ্টদের এ নির্দেশনা দেন।
সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস), রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্বর্ণ খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠকে স্বর্ণ ব্যবসার বর্তমান বাস্তবতা, সম্ভাবনা এবং নীতিমালা বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতিতে স্বর্ণ খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে এটি প্রয়োজনীয় নীতি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর বাইরে ছিল। এর জন্য শুধু ব্যবসায়ীদের দায়ী করা যাবে না, বরং নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার দুর্বলতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি বলেন, “একটি স্বীকৃত ব্যবসায়িক খাত দীর্ঘদিন আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সময়মতো প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নেওয়ার কারণে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এখন লক্ষ্য হচ্ছে স্বর্ণ খাতকে বৈধ, স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।”
সরকারের নতুন উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে স্বর্ণের আমদানি, মজুদ, বিক্রি ও লেনদেনের প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। নীতিমালা কার্যকর হলে বৈধভাবে আমদানি করা স্বর্ণের হিসাব সংরক্ষণ, ব্যবসায়ীদের নিবন্ধন এবং বাজার পর্যবেক্ষণ আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ব্যবসায়ীদের কাছে কত পরিমাণ স্বর্ণ রয়েছে, কোথা থেকে তা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং কী পরিমাণ বিক্রি হচ্ছে—এসব তথ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারির আওতায় আনতে হবে। এতে একদিকে যেমন বাজারে স্বচ্ছতা বাড়বে, অন্যদিকে অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।
স্বর্ণের অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক দেশ তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পাশাপাশি স্বর্ণ সংরক্ষণ করে। কারণ স্বর্ণকে দীর্ঘদিন ধরে মূল্য সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে যদি বৈধভাবে বড় পরিমাণ স্বর্ণ আমদানি হয় এবং তা দেশের অর্থনীতির ভেতরে থাকে, তাহলে এটি এক ধরনের সম্পদ সংরক্ষণ হিসেবে কাজ করবে। তবে একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে স্বর্ণ চোরাচালানের মাধ্যমে দেশের বাইরে চলে না যায়।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় বাজার ও আন্তর্জাতিক বাজারদরের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকলে চোরাচালানের সুযোগ তৈরি হয়। তাই কর ও শুল্ক কাঠামো নির্ধারণের সময় আন্তর্জাতিক বাজার, বিশেষ করে দুবাইয়ের মতো বড় স্বর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রের দামের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।
তিনি বলেন, কোনো ব্যবসায়ী অন্য দেশের ব্যবসায়ীকে লাভবান করার জন্য নিজের ক্ষতি করবেন না। ফলে এমন একটি নীতি প্রয়োজন, যেখানে সরকারের রাজস্ব স্বার্থ, ব্যবসায়ীদের সক্ষমতা এবং ভোক্তাদের স্বার্থ—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য থাকবে।
নতুন নীতিমালায় শুধু স্বর্ণ আমদানি নয়, দেশে স্বর্ণালংকার তৈরি এবং রপ্তানির বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। সরকার মনে করছে, স্থানীয়ভাবে মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে তৈরি করা স্বর্ণালংকার আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণের চাহিদা মূলত অভ্যন্তরীণ বাজারনির্ভর। বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন উপলক্ষে স্বর্ণালংকারের ব্যবহার ব্যাপক। তবে ক্রমবর্ধমান দামের কারণে সাধারণ মানুষের জন্য স্বর্ণ কেনা কঠিন হয়ে উঠছে। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো গেলে ভোক্তারা তুলনামূলক স্বস্তি পেতে পারেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
স্বর্ণ খাতের রপ্তানি সম্ভাবনা নিয়েও আশাবাদী সরকার। বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, বিশ্বের কয়েকটি দেশের স্বর্ণ নীতি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো পর্যালোচনা করা হবে। বিশেষ করে ভারতসহ স্বর্ণালংকার রপ্তানিতে সফল দেশগুলোর আমদানি ব্যবস্থা, কর কাঠামো, মজুদ ব্যবস্থাপনা এবং রপ্তানি সুবিধার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত নীতিমালার তুলনা করা হবে।
বর্তমানে দেশের স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে একটি স্পষ্ট নীতিমালার দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের মতে, স্বর্ণ খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া গেলে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে।
তবে নীতিমালা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না, এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে চোরাচালান বন্ধ, বাজার তদারকি বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ নিয়মকানুন তৈরি করা জরুরি।
সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সম্ভাব্য ঝুঁকি ও বাস্তবায়ন সমস্যা চিহ্নিত করে মতামত দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করা নয়; বরং দেশের স্বার্থে এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যাতে স্বর্ণ খাত দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও নিরাপদ ব্যবসায়িক খাতে পরিণত হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতামত পাওয়ার পর প্রয়োজন হলে আরও আলোচনা করা হবে এবং দ্রুত সংশোধিত স্বর্ণ নীতিমালা চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। নতুন এই নীতিমালা কার্যকর হলে দেশের স্বর্ণ ব্যবসায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে আশা করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।