শীর্ষ মাদক কারবারিদের তালিকা তৈরি হচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৬ বার
শীর্ষ মাদক কারবারিদের তালিকা তৈরি হচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মাদক নামের এক ভয়াল মরণনেশা আজ আমাদের সমাজ ও জাতীয় অগ্রযাত্রাকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দেশের তরুণ সমাজকে রক্ষা করা এবং মাদকের বিস্তার রোধ করা বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই সংকট উত্তরণে দেশজুড়ে মাদকের বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক ও কঠোর যুদ্ধ ঘোষণা করেছে প্রশাসন। এরই ধারাবাহিকতায়, দেশের শীর্ষ মাদক কারবারিদের একটি নির্ভুল ও নির্মোহ তালিকা তৈরির কাজ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে চলছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গত বৃহস্পতিবার রাতে পর্যটন নগরী কক্সবাজার শহরের ঐতিহ্যবাহী হিলডাউন সার্কিট হাউজে জেলা প্রশাসন আয়োজিত ‘মাদক প্রতিরোধ ও আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন সংক্রান্ত সভা’ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন।
বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে অনুষ্ঠিত ওই উচ্চপর্যায়ের সভায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়ন এবং সীমান্তবর্তী ও উপকূলীয় অঞ্চলে মাদকের রমরমা ব্যবসা বন্ধ করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, মাদক ব্যবসার সঙ্গে যারা সরাসরি জড়িত এবং যারা এই বিশাল সিন্ডিকেটের মূলহোতা বা গডফাদার হিসেবে পর্দার আড়ালে থেকে অপরাধ পরিচালনা করছে, তাদের সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রস্তুত করবে বিশেষ টাস্কফোর্স। এই তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব বা শৈথিল্য দেখানো হবে না বলে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন। তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পরেই সরকারের পক্ষ থেকে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোরতম সামরিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে, যাতে এই মরণনেশার জাল চিরতরে ছিন্ন করা সম্ভব হয়।
বিশেষ করে ইয়াবার মতো ভয়ংকর মাদকদ্রব্যের অনুপ্রবেশ ও বিস্তার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন যে, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কক্সবাজার ও এর আশেপাশের সীমান্ত এলাকাগুলো ইয়াবা চোরাচালানের প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই ইয়াবার আগ্রাসনের কারণেই আমাদের দেশের তরুণ ও যুবসমাজ প্রতিনিয়ত ভয়ংকর মাদকাসক্তির অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে, যা একটি জাতির ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত অশনিসংকেত। যুবসমাজকে রক্ষা করতে না পারলে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি মুখ থুবড়ে পড়বে, আর তাই বর্তমান সরকার মাদক নির্মূলের এই লড়াইয়ে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে নারাজ। সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে প্রশাসনের প্রতিটি স্তর এখন মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ টাস্কফোর্সের গৃহীত বিভিন্ন কৌশলগত সিদ্ধান্ত সভায় বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান যে, মাদক চোরাচালানের যতগুলো রুট বা পথ রয়েছে, সেগুলোকে সুনির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং ওই সমস্ত পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থায়ী ক্যাম্প বা চেকপোস্ট স্থাপন করা হবে। কেবল স্থলপথেই নয়, বরং জলপথেও মাদক কারবারিরা যাতে কোনোভাবেই তাদের অপতৎপরতা চালাতে না পারে, তার জন্য নৌবাহিনী এবং কোস্টগার্ডের টহল ও নজরদারি বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, যারা সরাসরি মাদকের চালান বহন করে বা বাহক তথা ক্যারিয়ার হিসেবে কাজ করে, তাদেরও কঠোর নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে এবং চিহ্নিত করে আইনের মুখোমুখি করা হবে।
উক্ত গুরুত্বপূর্ণ আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ক সভায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য শামীম আরা স্বপ্না এবং কক্সবাজার জেলার জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নানসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন। স্থানীয় প্রশাসনের এই সম্মিলিত উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, মাদক নির্মূলের এই লড়াইয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক তৎপরতা উভয়েই সর্বোচ্চ মাত্রায় রয়েছে। সভায় অংশ নেওয়া জনপ্রতিনিধিরা নিজ নিজ এলাকার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানান।
মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে এই কঠোর অবস্থানের ফলে অপরাধজগতের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে ইতিমধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ও অস্থিরতা শুরু হয়েছে। সাধারণ মানুষ ও সচেতন নাগরিক সমাজ সরকারের এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত সাধুবাদ জানিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল, বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে তরুণদের বিপথগামী হওয়ার দৃশ্য অভিভাবকদের প্রতিনিয়ত ভাবিয়ে তুলত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ঘোষণায় সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে যে, হয়তো এবার সত্যি সত্যিই এই মরণনেশার হাত থেকে সমাজ মুক্তি পাবে। তবে কেবল তালিকা তৈরি বা সাময়িক অভিযানই যথেষ্ট নয়, এর স্থায়ী সমাধানের জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলাও সমানভাবে জরুরি বলে মনে করছেন সমাজবিশ্লেষকরা।
মাদক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী সিন্ডিকেটগুলোর শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত রয়েছে। অতীতেও নানা সময় মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হলেও গডফাদাররা প্রায়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যেত। কিন্তু বর্তমান সরকারের এই নির্মোহ তালিকা তৈরি এবং টাস্কফোর্সের সমন্বিত উদ্যোগ যদি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা অপরাধীদের শিকড় উপড়ে ফেলতে সক্ষম হবে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও যুবসমাজকে টিকিয়ে রাখতে মাদকের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে কোনো আপস চলবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই স্পষ্ট বার্তার পর এখন অপেক্ষা শুধু মাঠপর্যায়ে তার যথাযথ বাস্তবায়ন দেখার। একটি সুস্থ, সবল ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার এই সংগ্রামে সরকারের পাশাপাশি দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিককে এগিয়ে আসতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সার্বিক সহযোগিতা করতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত